ধলেশ্বরী নদী এখন মৃতপ্রায়, হেঁটে পার হচ্ছে গরু-ছাগল

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০১৯, ১৫:৪৬

নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম ধলেশ্বরী নদী। এটি মূলত যমুনার শাখা নদী। যা যমুনা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। আরো দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে ষাটনলের কাছে মেঘনা নদীতে পতিত হয়ে হারিয়েছে তার নিজস্ব রূপ। এক সময় যে নদীর বুক চিড়ে চলতো পালতোলা নৌকা, আজ সে নদী শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে চর পড়ে তৈরি হয়েছে নতুন রাস্তার যার উপর দিয়ে চলছে মোটরসাইকেল, ট্রাক্টর, মাল বোঝাই ঘোড়ার গাড়ি।

টাংগাইলের নাগরপুর উপজেলার নলসন্ধ্যা, নন্দপাড়া, কেদারপুর, আগদিঘুলিয়ার বিভিন্ন অংশ জুড়ে পড়েছে বালুর বিশাল চর। ২৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীর সর্বোচ্চ গভীরতা ছিল ২৬৫ ফুট বা ৮১ মিটার এবং গড় গভীরতা ছিল ১২২ ফুট বা ৩৭ মিটার। কিন্তু গত কয়েক বছর যাবত কোন প্রকার ড্রেজিং এবং নদী শাসন না করার ফলে নদীর গভীরতা নেই বললেই চলে। ভরা মৌসুমেও কোথাও কোথাও এর গভীরতা দাঁড়ায় ১০ ফুট। বর্ষা মৌসুমে নদীর গভীরতা না থাকায় এর দুই তীরে তীব্র ভাঙ্গন দেখা দেয়। ফলে নদীর দুই পাড় ভেঙ্গে আরো বেশি পলি জমে চরের সৃষ্টি হয়। অথচ এক সময় এই নদীর বুকেই ভেসে বেড়াতো বড় বড় বাণিজ্যিক জাহাজ, পাট বোঝাই ছোট-বড় পাল তোলা নৌকা।

আমাদের দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা সব কিছুতেই রয়েছে নদীর প্রভাব। ধলেশ্বরীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় বদলে যায় অনেক মানুষের জীবন-জীবিকার ধরণ। এক সময় নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছিল জেলেপল্লী। সে সময় এই নদীতে পাওয়া যেত রুই, কাতলা, চিতল, আইড়সহ বিভিন্ন মাছ।

আরো পড়ুন: স্কুল থেকে ফেরার পথে ট্রাকচাপায় ভাই-বোনের মৃত্যু, বাবা আহত

নদীর আশে পাশের কৃষি জমি এখন পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে বদলে গেছে কৃষিকাজের ধরণও। এখন ধলেশ্বরীর তীর ঘেঁষে বিষাক্ত তামাক চাষের মহোৎসব চলছে। অন্য ফসলের চেয়ে লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছরই তামাক চাষের জমির পরিমাণ বেড়ে চলছে। তামাক চাষে মাত্রারিক্ত রাসায়নিক ও বিষ ব্যবহারের কারণে জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে। বিষক্রিয়ায় নদীর মাছ মরে ভেসে উঠছে। প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে এখন বিলুপ্ত অনেক প্রজাতির মাছ।

দখল, দূষণ ও উজান হতে আসা পলিমাটিতে ভরাট হওয়ায় ধলেশ্বরী মৃত প্রায়। বেশীর ভাগ এলাকায় এই নদী এখন ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। কোন কোন অংশ একেবারে শুকিয়েও যায়। নদী তার নাব্যতা, গভীরতা, আকার-আকৃতি হারিয়েছে। তাছাড়া বর্তমান সরকারের আমলে এ নদীর উপর নাগরপুর উপজেলার খোরশেদ মার্কেটে শামসুল হক সেতু ও কেদারপুরে শেখ হাসিনা সেতু নির্মিত হলেও নদীতে ড্রেজিং করে নদী শাসন করা হয়নি। সেতুর নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে কালের সাক্ষী আমাদের ধলেশ্বরী নদী। আর এর জন্য দায়ী শিল্পবর্জ্য, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন ও নদীর তীরে তামাক চাষ। এসব কারণে পরিবেশ ও জলবায়ু মারাত্মক হুমকির মুখে। নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় প্রবাহ কমে গেলেও বর্ষা ঋতুতে স্বাভাবিক বন্যা না হয়ে  মাঝে মাঝে তা প্রলয়ংকারী রূপ নেয়।

ধলেশ্বরী নদীর অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী যমুনা সেতুও। ৯০ এর দশকে যমুনা নদীর উপর সেতু তৈরির সময় ধলেশ্বরীর গতিপথ পরিবর্তন করার প্রবণতাকে ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করে পাথর ফেলে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয় ধলেশ্বরীর চ্যানেলটি। আর তাতেই ধলেশ্বরীর মেরুদণ্ড ভেঙ্গে পরে। ধলেশ্বরী হারিয়ে ফেলে তার ঐতিহ্য।

নদী তীরবর্তী কেদারপুরের লোকজন জানান, নদীর দুই পাড় ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে এমন পর্যায়ে এসেছে যে সময় মত নদী ড্রেজিং করে নদী শাসন না করা হলে মোকনা ইউনিয়নের কাজীবাড়ি অংশ দিয়ে ভেঙ্গে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যাবে। ফলে অকার্যকর হয়ে পড়বে সদ্য নির্মিত শেখ হাসিনা সেতু।

স্থানীয় সাংসদ আহসানুল ইসলাম টিটু বলেন, ‘আমার নির্বাচনী অঙ্গীকারই ছিলো এই ধলেশ্বরী নদীর স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনা। সেই লক্ষ্যে আমি কাজ করে যাচ্ছি। নদী খননের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নদী ড্রেজিং করে নাব্যতা ফিরিয়ে এনে জনগণকে দেওয়া আমার কথা রাখতে চাই।’

ইত্তেফাক/বিএএফ