আমরা সহজাতভাবেই প্রতিযোগিতার অংশ

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২১, ২২:০৬

প্রতিযোগিতা শব্দটি মানবজীবনের সামাজিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হইয়া থাকে; কিন্তু আমরা লক্ষ করিলেই দেখিতে পাই, এই প্রতিযোগিতা সকল ক্ষেত্রেই রহিয়াছে। বলা যায়, প্রতিযোগিতার কোনো শুরু নাই, প্রতিযোগিতা লইয়াই আমরা জন্ম গ্রহণ করি। আমরা যখন স্কুলজীবনে প্রবেশ করি, সেইখানেই প্রতিযোগিতাটি প্রথম প্রত্যক্ষ করিতে পারি মাত্র; কিন্তু এই প্রতিযোগিতা কি স্কুলেই শুরু হয়? তাহা নহে। আমরা মাতৃগর্ভে স্থান করিয়া লই লক্ষকোটি সহযাত্রীর সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া। ইহাও একটি প্রতিযোগিতা বটে। ইহার অর্থ হইল, আমরা সহজাতভাবেই প্রতিযোগিতার অংশ। কেবল মানবজীবন নহে, প্রকৃতির দিকে তাকাইলেও আমরা এই প্রতিযোগিতা দেখিতে পাই। বাঁচিয়া থাকিবার জন্য বনের মধ্যে সকাল-সন্ধ্যা পশুকুল প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে। যাহার কারণে বিবর্তনবাদ পড়িয়া ইংরেজ দার্শনিক হার্বার্ট স্পেনসার বলিয়াছিলেন সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘সারভাইবাল ফর দ্য ফিটেস্ট।’

তবে প্রতিযোগিতায় হারিলেই যে অস্তিত্ব বিলীন হইয়া যাইবে তাহা মানবজীবনের জন্য সঠিক নহে। ইংরেজিতে একটি কথা রহিয়াছে, ‘তুমি সব সময় প্রতিযোগিতায় জয়ী হইবে তাহা নহে; কিন্তু তোমাকে সত্যিকার প্রতিযোগী হইতে হইবে।’ ব্যবসায়-বাণিজ্য, খেলাধুলা হইতে শুরু করিয়া নদীতে মত্স্য শিকার করিতে হইলেও প্রতিযোগিতায় নামিতে হয়। এই প্রতিযোগিতা ধনী-দরিদ্র সকল দেশেই বিরাজমান। তবে পরিশ্রমী প্রতিযোগী সর্বদা চূড়ান্ত শিরোপা হাতে না পাইলেও তাহার প্রতিযোগিতা বৃথা যায় না। এই জন্যই ‘মরাল ভিক্টরি’ বলিয়া একটি কথা চালু আছে; কিন্তু এই প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ না হইয়া যাহারা ভাগ্যান্বেষণ করিয়া থাকেন তাহাদের ভাগ্য ফেরা দুষ্কর হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই সম্পর্কে ইসলামের পবিত্র গ্রন্থেও রহিয়াছে সুস্পষ্ট উচ্চারণ। সুরা রাদ-এ বলা হইয়াছে, ‘তাহার (মানুষের) জন্য তাহার সম্মুখভাগে এবং পশ্চাদ্ভাগে সার্বক্ষণিক প্রহরী নিযুক্ত রহিয়াছে, যে আল্লাহর নির্দেশে তাহাকে রক্ষা করে এবং আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তাহারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন না ঘটায়।’

আধুনিক যুগে, বিশেষ করিয়া শিল্পবিপ্লবের পর মনুষ্য সমাজে যতই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসারিত হইয়াছে, ততই প্রতিযোগিতা তীব্র হইয়াছে। বর্তমান পরিস্থিতি ইহাই সাক্ষ্য দেয় যে, যাহারা প্রতিযোগিতায় নামিতে নারাজ তাহাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হইয়া পড়া স্বাভাবিক বিষয় হইয়া গিয়াছে। ইহা ঠিক, বর্তমান করোনা ভাইরাসের কারণে শুধু বাংলাদেশ নহে, সমগ্র বিশ্বেই মন্দা অবস্থা তৈরি হইয়াছে এবং প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র আরো তীব্র আকার ধারণ করিয়াছে। বহু দেশে শুধু জীবন নহে, অর্থনৈতিক মন্দা তীব্র আকার ধারণ করিয়াছে। সরকারগুলি হিমশিম খাইতেছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধরিয়া রাখিতে। সরকারগুলির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ব্যাবসায়িক সম্প্রদায় তাহাদের উত্পাদন ও সরবরাহ লইয়া বিপাকে রহিয়াছে। ফলে সাধারণ খাটিয়া খাওয়া মানুষের উপর সেই ঢেউ আসিয়া পড়া অস্বাভাবিক নহে। আর এই ঢেউ হইতে নিজেকে বাঁচাইতে একদিকে যেমন তীব্র প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইতে হইবে, তেমনি আবার ধৈর্যের পরিচয় রাখিতে হইবে। কারণ ধৈর্য কেবল একটি মানবিক গুণই নহে, ইহা মানুষের বিপত্সংকুল অবস্থায় দাওয়াইয়ের কাজ করিয়া থাকে।