হাইকোর্ট বলেছে, দুর্নীতি বা অন্যান্য মামলার অনুসন্ধান বা তদন্ত পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা বা চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে দেশে কোনো আইন ও বিধি নাই। তবে সময়ের প্রয়োজনে এ ধরনের আইন ও বিধি প্রণয়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু আইন ও বিধির অনুপস্থিতিতে সরকার কিংবা রাষ্ট্রের অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ বা সংস্থা শুধু ‘খেয়ালের’ বশবর্তী হয়ে দেশের কোনো নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করতে বা নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে না মর্মে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, এক জন নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতা ব্যক্তিজীবনের স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত, যা শাশ্বত। এ স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে হলে আইন নির্ধারিত নিয়মে বা পদ্ধতিতে করতে হবে।
‘আতাউর রহমান বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য’ মামলায় বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেন। সম্প্রতি এ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় আমাদের সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট অভিমত এই যে, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত হবে অনুসন্ধান বা তদন্ত পর্যায়ে যে কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তির দেশত্যাগ ঠেকাতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি প্রণয়ন করা। যতক্ষণ পর্যন্ত এ ধরনের আইন ও বিধি প্রণীত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতের কাছে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আবেদন করে অনুমতি গ্রহণ করা।
নীতিমালা হাইকোর্টের; নিষেধাজ্ঞার
মেয়াদ ৬০ দিনের অধিক নয়
ব্যক্তির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিতে সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধির অনুপস্থিতির অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে হাইকোর্ট একটি নীতিমালাও করে দিয়েছে। ঐ নীতিমালা অনুযায়ী অনুসন্ধান বা তদন্ত পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা/কর্তৃপক্ষ যথাযথ প্রতিনিধির মাধ্যমে এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে আবেদন জানালে আদালত সন্তুষ্টি সাপেক্ষে একটি সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য, যার মেয়াদ ৬০ দিনের অধিক হবে না নিষেধাজ্ঞার আদেশ কিংবা স্বীয় বিবেচনায় ন্যায়সঙ্গত অন্য কোনো আদেশ প্রদান করতে পারবে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা পক্ষ ঐ আদেশ বাতিল বা প্রত্যাহারের জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন জানাতে পারবেন। সেক্ষেত্রে আদালত উভয়পক্ষের বক্তব্য শ্রবণ এবং কাগজাদি, যদি দাখিল করা হয় পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদান করতে পারবে। নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা/কর্তৃপক্ষ পুনরায় সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন করতে পারবে।
হাইকোর্ট রায়ে বলেছে, এটা বাস্তবতা যে দুর্নীতি কিংবা মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত মামলাসমূহ অনুসন্ধান বা তদন্ত কিছুটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। যদিও সংশ্লিষ্ট বিধিতে অনুসন্ধান বা তদন্তের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের বিচারিক অভিজ্ঞতা বলে যে, কমিশন কিংবা অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থা/কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুসন্ধান বা তদন্ত কার্যক্রম আইন ও বিধিতে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে পারে না। এটাও বাস্তবতা যে, অনুসন্ধান বা তদন্ত পর্যায়ে সন্দেহভাজন বা অভিযুক্ত অনেকে বিভিন্ন অজুহাতে দেশত্যাগ করছে এবং পরবর্তীকালে তাদের আর আইন আদালতের সম্মুখীন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ সব বাস্তবতাকে আমলে নিয়ে দুর্নীতি বা মানি লন্ডারিং মামলায় কিংবা অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রেও অনুসন্ধান বা তদন্ত পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা বা তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি প্রণয়ন সময়ের চাহিদাও বটে। সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধির অনুপস্থিতিতে কোনো তদন্ত সংস্থার দাপ্তরিক আদেশ দিয়ে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার পদক্ষেপ বা কার্যধারা সংবিধান পরিপন্থি।
আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে
এই মামলায় আদালতের কাছে মুখ্য আইনগত বিষয় ছিল যে, সুনির্দিষ্ট কোনো আইন বা বিধি ছাড়া এক জন নাগরিককে শুধু সন্দেহভাজন হওয়ার কারণে কিংবা কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান বা তদন্ত পর্যায়ে দেশত্যাগে বাধা দেওয়া সংবিধান ও আইনসঙ্গত কিনা? এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনও দেশত্যাগে বাধা দেওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধি আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে পারেননি। তবে তিনি বলেন, দুদক যেহেতু একটি স্বাধীন সংস্থা সেহেতু তারা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির চলাফেরার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে হলে আইন নির্ধারিত নিয়মে বা পদ্ধতিতে করতে হবে। যার বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে তারও অধিকার আছে কী কারণে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অর্থাত্ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। এটাই আইনানুগ বিচারের মূল কথা। সেজন্য আমাদের বলতে দ্বিধা নাই যে, নাগরিকের চলাফেরার সাংবিধানিক অধিকার কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের খেয়াল খুশি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ বা বারিত করা অসাংবিধানিক।
যে মামলায় এলো এ রায়
আতাউর রহমান জন্মসূত্রে একজন বাংলাদেশের নাগরিক। পরবর্তী সময়ে সুইডেনে নাগরিকত্ব লাভ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ও সুইডেনে তার ব্যবসা চলমান এবং তার পরিবার সুইডেনে অবস্থান করছে। গত বছরের ২৪ আগস্ট দুদক তাকে সম্পত্তির হিসাব দাখিল করতে নোটিশ দেয়। ২২ অক্টোবর সম্পত্তির হিসাব দাখিল করেন তিনি। ঐ বছরের ২১ ডিসেম্বর পত্রিকার মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে দুদকের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে তাকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। পরে এ সংক্রান্ত চিঠির কপি সংগ্রহ করে হাইকোর্টে রিট করেন। ঐ রিটের দীর্ঘ শুনানি নিয়ে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার চিঠি অবৈধ ঘোষণা করে এ রায় দেয় হাইকোর্ট। এই রায়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত আপিল করেছে দুদক। ঐ আপিল এখন শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানান দুদক কৌঁসুলি খুরশীদ আলম খান। তিনি বলেন, রায় স্থগিতের জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু চেম্বার আদালত রায় স্থগিত না করে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে মামলাটি পাঠিয়েছেন।
