চিন্তারা কবে সবুজ হবে?

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৩৭

২০২০ সালে ঢাকার নাগরিকরা কতখানি প্রকৃতি ঘনিষ্ঠ থাকবেন কিংবা কীভাবে বৈরী প্রকৃতিকে মোকাবিলা করবেন? তখনকার বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাবে কিনা, ফসলি অঞ্চলে শুষ্ক জলবায়ু দেখা দেবে কিনা, কত শতাংশ বৃষ্টিবন থাকবে, কী পরিবর্তন আনতে হবে সম্ভাব্য তিন কোটি নাগরিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়, মাটিতে মাত্রাতিরিক্ত নাইট্রোজেন সারের মিশ্রণে তা কতটা দূষিত হয়ে উঠবে, পানি কতটা আর্সেনিকবহুল হবে, বাতাস কতটা কার্বনময় হবে অথবা কীভাবে এসবের ক্ষতি প্রতিরোধ করা যাবে— তা নিয়ে বিস্তর লিখেছেন নগর নিসর্গবিদ এবং নগর পরিকল্পকরা। নগরের ম্লান সবুজকে গভীর সবুজে পরিণত করার নানান উপায় নিয়েও লিখেছেন। কিন্তু নীতিনির্ধারক মহল সেসব কিছু আমলে এনেছেন বলে মনে হয় না। নইলে কেন ঊনিশ শতকের সবুজ ঢাকা আজকের এই ধূলিধূসর ঢাকায় পরিণত হলো? নদী উদ্যান কিংবা পাখিবিশেষজ্ঞরা আমাদের নগরের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত নেই। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন তার ওজনের ৬০০ গুণ বেশি আবর্জনা তৈরি করে। নিশ্চিতভাবে পরিসংখ্যানটি আশঙ্কার। এর মধ্যে এমন অনেক আবর্জনা আছে— যা মোটেই পচনশীল নয়। গৃহস্থালি সামগ্রীর ৬ শতাংশই এখন প্লাস্টিক। প্রতিদিন এই হার বাড়ছে।

প্রথমে আলোর কথায় আসি। মহাশূন্য থেকে পৃথিবীতে সূর্যের দুইশ’ কোটি ভাগের একভাগ আলো এসে পৌঁছায়। মনে রাখা দরকার ওজোন বলয়ের নানা স্তরে আটকে থাকা আলো, ফাঁক গলিয়ে যেটুকু পৃথিবীতে পৌঁছায় তা প্রত্যেক প্রাণীর জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এই আলোর ভাগটুকুও আমরা ঠিকমত পাচ্ছি না হাইরাইজ বিল্ডিংগুলোর কারণে। অথচ ফসল পাকানিয়া রোদ, কাঁঠাল পাকানিয়া রোদ, কাঠফাটা রোদ সবই কিন্তু জরুরি। কোনো আবেগকাতরতা থেকে নয়, নিরেট সত্য হলো এই বাংলাদেশের মাটির গুণগত মান এত ভালো যে এই মাটিতে অনায়াসে অভিযোজিত হয়ে যায় ব্রাজিল থেকে আসা রেইন ট্রি, মাদাগাসকার দ্বীপের গগন শিরীষ, মেক্সিকোর জিনিয়া কসমস চীনের হলিহক, চন্দ্রমল্লিকা, শেয়ালকাঁটা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার লিলি। আমেরিকার উষ্ণম্ললের সফেদা অনায়াসে আমাদের নিজস্ব ফলে পরিণত হয়। অভিযোজিত বৃক্ষের সংখ্যার শেষ নেই। শুধু কি মাটিই অপরিমেয় গুণমানসম্পন্ন? না। একই রকম খাঁটি আমাদের জলাভূমি হাওর-বাঁওড় বাদা অঞ্চলও। অসংখ্য নদী হাজার হাজার বছর ধরে লাখ লাখ টন পলিমাটি ঢেলে ঊর্বর করেছে জলাভূমি। তাই সুদূর ব্রাজিলের কচুরিপানাও এদেশের জলাভূমিতে চমত্কার মানিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশের মাটিতে অনায়াস জন্মানো সেগুনগাছ এবং তার বেড়ে ওঠা পশ্চিমাদের বিস্ময়। অথচ ঢাকার এককালের সেগুনের বাগান অবজ্ঞা অবহেলায় এখন কংক্রিটের বাগান। আমাদের বৃক্ষগুলো ভেষজ মূল্যে অনন্য হওয়া সত্ত্বেও দুর্ভাগা। অথচ একটি বৃক্ষ কত প্রাণের আশ্রয়। একটি তালগাছের ঝাঁকড়া মাথায় অনায়াসে ঠাঁই পায় ধেড়ে ইঁদুর চামচিকা। চামচিকা বাঁদুড় উইপোকার মতো প্রাণী মানুষ তাচ্ছিল্যের চোখে দেখে কিন্তু প্রাণচক্র রক্ষায় এদের ভূমিকাও অসীম। প্রাণের এই বৈচিত্র্য মানুষের জন্যই সবচেয়ে বেশি দরকারি। অথচ মানুষই সবচেয়ে বেশি প্রাণ-হন্তারক। টুনা মাছ ধরার জালে মানুষের হাতে এ পর্যন্ত মারা গেছে ৬৫ লাখ মানুষবান্ধব ডলফিন। মানুষের চামড়ায় প্রসাধন সামগ্রী কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করবে কিনা তা জানার উদ্দেশ্যে আগে গিনিপিগের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে। এভাবে মানুষ ২১ হাজার প্রজাতির গিনিপিগ হত্যা করেছে। আর বৃক্ষ হত্যার তো সীমা-পরিসীমা নাই। পৃথিবীতে মানুষ এসেছে বড়জোর দশ লাখ বছর। বৃক্ষের জন্ম তের কোটি বছর আগে। পৃথিবীর ওপর মানুষের চেয়ে বৃক্ষের দাবি বেশি এটুকু মনে রাখলে মানুষেরই ভালো। যন্ত্রণাদগ্ধ বৈষম্যের এই পৃথিবীতে প্রকৃতিই একমাত্র সাম্যবাদী। যে সবাইকে সমান আশ্রয় দেয়। তাছাড়া প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তো শুধু অর্থনীতিনির্ভর হওয়ার কথা নয়। অথচ সড়ক প্রশস্ত করার জন্য কিংবা কোনো অবকাঠামো নির্মাণের জন্য যখনতখন মহীরুহসম বৃক্ষগুলো কেটে ফেলে মানুষ। কোনো বৃক্ষ কাটার আগে অবশ্যই উচিত উদ্যানবিদ, বৃক্ষবিদদের সঙ্গে আলাপ করার। প্রকৃতি চর্চা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হওয়ার কথা। জীবন্ত প্রতিটি প্রাণীর জন্য, একটি তৃণের জন্য, ঘাসের প্রতিটি পাতার জন্য, প্রতিদিনের কিছুটা সবার বরাদ্দ রাখা উচিত। মানুষ কি প্রয়োজনীয় এ কাজটি করতে পারছে? কতখানি প্রকৃত ঘনিষ্ঠ হতে পারছে নাগরিকরা? তারচেয়েও বড় ভাবনার বিষয় ভবিষ্যতে কতখানি পারবে? বর্ষীয়ানরা কত অনায়াস বলে যান ‘বাওবাব গাছের বাকলে আঁঁশের দড়ি এমনই মজবুত হয় যে হাতি পর্যন্ত বেঁধে রাখা যায়। গাবের আঠা নৌকা ও জালের ফাটল বন্ধে সবচেয়ে ভালো। তালপাতার পাখার বাতাসই সবচেয়ে মিষ্টি। বেলের কাঠ দিয়ে ভালো গরুর গাড়ি তৈরি করা যায়। শিমুল কাঠে সবচেয়ে ভালো হয় দেশলাইয়ের খোল আর চায়ের বাক্স। বই বাঁধাইয়ে সবচেয়ে ভালো শিমুলের আঠা। আমলকি এবং কেওড়া হরিণের প্রিয় ফল। পাখি বাঁদুড় আর কাঠবিড়ালিদের ভীষণ প্রিয় গোলাপজাম। আমরা এসবের কিছুই জানি না। পরের প্রজন্ম কোন্টা ধান গাছ আর কোন্টা পাটগাছ তার পার্থক্য বুঝতে আশ্রয় নেবে গুগলের। অথচ একসময় সব মানুষ একই দেশে বসবাস করতো, একই ভাষায় কথা বলতো, একই সংস্কৃতির অধীনে ছিল তাদের বসবাস। তারপর ধর্ম বর্ণ জাত পাত নানান কারণে মানুষ পৃথক হয়ে গেল কিন্তু প্রকৃতি এখনও অভিন্ন। বার্চ, ম্যাপেল, মেহগনি, শিরীষ কিংবা শাল কোনো না কোনোভাবে পরস্পরের সঙ্গে আত্মীয়তা রেখেছে। সেই সুদূরের গ্লোরি লিলি বাংলার মাটিতে এসে নাম নিয়েছে উলটচাণ্ডল।

দুই

নগরে বৃক্ষের সৌন্দর্য ধারণ করার জন্য পথের দু’পাশে যেসব গাছপালা লাগানো হয় তার অধিকাংশ ঠিক সড়ক বিভাজিকায় লাগানোর উপযুক্ত নয়। গাছ যথাযথভাবে বেড়ে ওঠার জন্য নেই কোনো নিয়মিত তদারকি। একটি সবুজ ঢাকা যেখানে হাইড্রোলিক হর্নের পরিবর্তে গাছে গাছে চেনা অচেনা পাখির সুর মুখর করে রাখবে পথিকের কান, তেমন ঢাকার জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে আমাদের? নগরবিদদের চিন্তাগুলো সবুজ হলেই বোধহয়।

n লেখক :প্রাবন্ধিক ও গবেষক