কিংবদন্তি অভিনেত্রীর বিদায়

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২১, ০১:৪৯

করোনার সঙ্গে লড়াইয়ে অবশেষে হেরে গেলেন বাংলা সিনেমার কিংবদন্তিতুল্য অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী। বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মিষ্টি মেয়ে’ বলে খ্যাত এই অভিনেত্রী করোনায় আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ ১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে পাড়ি জমালেন অনন্তলোকে (ইন্না লিল্লাহি ... রাজিউন)। কবরীর ছেলে শাকের চিশতী জানান, গতকাল শুক্রবার রাত ১২টা ২০মিনিটে রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। কবরীর মৃত্যুতে সারা দেশের মানুষের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। করোনার ছোবলে এভাবে আর কত প্রাণ যে হারাতে হবে, আর কত প্রিয়মুখ যে হারাতে হবে— সেই শোকে আকুল দেশের মানুষ।

বাংলা সিনেমার শুরু থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত প্রায় পুরোটাই কবরী যেন কালের সাক্ষী হয়ে বিরাজ করেছেন। নায়ক রাজ রাজ্জাককে বাদ দিলে তার সময়ের বেশিরভাগ নায়কের শুরু কবরীর সঙ্গে সিনেমায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। তার অভিনীত অধিকাংশ সিনেমা ব্যবসা সফল হয়েছে। তিনি বাংলার মানুষকে হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন। ছেলে দর্শকদের কাছে তিনি ছিলেন রোমান্সের রানী। তার সহজ সরল রোমান্টিক অভিনয় দর্শকের হূদয়ে ঝড় তুলেছে। ৫০ বছরের বেশি সময় চলচ্চিত্রে রাজ্জাক, ফারুক, সোহেল রানা, উজ্জ্বল, জাফর ইকবাল ও বুলবুল আহমেদের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ঢাকার চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি ছিল রাজ্জাক-কবরী।

সারাহ বেগম কবরীর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি শোকবার্তায় বলেন, কবরী ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার মৃত্যু দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকবার্তাায় বলেন, দেশের অভিনয় জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র কবরীর অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতি ও সংস্কৃতি অঙ্গনে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এছাড়া অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, তথ্য ও সমপ্রচার মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এবং সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ  পৃথক শোক বার্তা পাঠিয়েছেন। 

গত ৫ এপ্রিল করোনা পজিটিভ হন কবরী। সেই রাতেই ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। ৭ এপ্রিল দিবাগত রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিত্সকেরা। অবশেষে ৮ এপ্রিল দুপুরে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে কবরীর জন্য আইসিইউ পাওয়া যায়। বৃহস্পতিবার বিকেলে তাকে লাইফ সাপোর্ট নেওয়া হয়। সব চেষ্টাই বিফলে গেল। তাকে বাঁচানো সম্ভব হলো না।

১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ দিয়ে নায়িকা হিসাবে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় কবরীর। এরপর একে এক অভিনয় করেন ‘জলছবি’ ও ‘বাহানা’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘আবির্ভাব’, ‘বাঁশরি’, ‘যে আগুনে পুড়ি’,  ‘দীপ নেভে নাই’, ‘দর্পচূর্ণ, ‘ক খ গ ঘ ঙ’ ও ‘বিনিময়’ চলচ্চিত্রে। মুক্তিযুদ্ধে সময় পাড়ি জমান ভারতে। যুক্ত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবারও চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

প্রত্যেক নায়কের সঙ্গেই তার হিট ছবি রয়েছে। নায়ক রাজ্জাকের সঙ্গে ‘রংবাজ’, ১৯৭৫ সালে নায়ক ফারুকের সঙ্গে ‘সুজন সখী’ ছাড়িয়ে যায় তার আগের সব জনপ্রিয়তাকে। আরও রয়েছে ‘আগন্তুক’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘সারেং বৌ’, ‘দেবদাস’, ‘হীরামন’, ‘চোরাবালি’ ও ‘পারুলের সংসার’। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তার জনপ্রিযতার কারণে ২০০৮ সালে নারায়ণগঞ্জ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন কবরী।

১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে জন্মগ্রহণ করেন কবরী। তাঁর আসল নাম ছিল মিনা পাল। বাবা শ্রীকৃষ্ণদাস পাল এবং মা লাবণ্য প্রভা পাল। ১৯৬৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে উঠেছিলেন তিনি। তারপর টেলিভিশন ও সবশেষে সিনেমায়। কবরী বিয়ে করেন চিত্ত চৌধুরীকে। সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর ১৯৭৮ সালে তিনি বিয়ে করেন সফিউদ্দীন সরোয়ারকে। ২০০৮ সালে তাঁদেরও বিচ্ছেদ হয়ে যায়। কবরী পাঁচ সন্তানের মা।

অভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাতা হিসাবেও ছিলেন দারুণ সফল। ২০০৫ সালে ‘আয়না’ নামের একটি ছবি নির্মাণের মাধ্যমে চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন কবরী। এমনকি ওই ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তিনি অভিনয়ও করেছিলেন। এরপর রাজনীতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। যুক্ত ছিলেন অসংখ্য নারী অধিকার ও সমাজসেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭-তে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘স্মৃতিটুকু থাক’।