গত বছর ২৯শে ফেব্রুয়ারি কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন এবং তালেবানদের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে চুক্তি হওয়ার পর থেকে আগামী ১৪ মাসের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সব সেনা সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোট। উল্লেখ্য, ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর আফগানিস্তানে সেনা মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় ২০ বছর ধরে চলা নানা সহিংসতার পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিতে আসতে বাধ্য হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘তালেবানরা আসলেই মহান যোদ্ধা আর এটা যদি আপনার বিশ্বাস না হয় তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়নকে জিজ্ঞেস করতে পারেন’। তার বিবৃতিতে এটা সুস্পষ্ট যে, তালেবানদের সঙ্গে যুদ্ধ করে তারা ক্লান্ত হয়ে গেছে। শুধু তালেবানদের সঙ্গে চুক্তি করেই যে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে, এটা নিছক গল্প ছাড়া আর কিছুই নয়। তালেবান ছাড়াও আফগানিস্তানে আরো অনেক সশস্ত্র গ্রুপ বিদ্যমান। শান্তি চুক্তি করার দুদিন পরেই সশস্ত্র বাহিনী তালেবান যোদ্ধাদের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা হামলা করে এটার প্রমাণ দেয়। গত ২০ জানুয়ারি ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন জো বাইডেন। তালেবানদের সঙ্গে ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকাকালে যে চুক্তিটি হয়েছে, সেটি ভেবে দেখার কথা বলেন বাইডেন। এতে আফগানের সশস্ত্র তালেবানদের মধ্যে একটা উত্তেজনা দেখা দেয়। তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলে দেয়, যদি সময়মতো আমেরিকা আফগান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার না করে তাহলে তারা সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য করাবে। অর্থাত্, প্রত্যক্ষ যুদ্ধের হুমকি। নানা জল্পনা-কল্পনা শেষে বাইডেনও আফগান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে সম্মত হন। বাইডেন বলেন, গত ২০ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধের ভার আমি চাই না আমার থেকে আর কোনো প্রেসিডেন্ট এর হাতে চলে যাক। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে চলা সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের অবসানের এখনই সময়।
আগামী ১১ সেপ্টেম্বর এর মধ্যে তিনি প্রায় ২ হাজার ৫০০ আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আফগানে চলা যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধটাকে ‘Forever war’ বলা হয়। এইযুদ্ধে প্রায় এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়, প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা হতাহত হয়। অপরদিকে আফগানিস্তানের ক্ষতির পরিমাণ তো বর্ণনাতীত। প্রায় ৩৮ হাজার বেসামরিক মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে এবং ৭২ হাজার মানুষ নানাভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছে। আফগান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে ন্যাটো জোটও তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। তালেবান মুখপাত্র জবিহুল্লাহ মুজাহিদ তার টুইটারে বলেছেন, ‘যদি চুক্তি লঙ্ঘন হয় এবং বিদেশি সৈন্য আফগান ছাড়তে ব্যর্থ হয় তাহলে সমস্যা আরো যৌগিক হবে এবং এজন্য দায়ী থাকবে তারা যারা চুক্তি লঙ্ঘন করবে।’ আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়ে অনেকেই পক্ষে এবং বিপক্ষে মতামত তুলে ধরছেন। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর থেকে এ পর্যন্ত আফগানিস্তানে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে প্রতিনিয়ত হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানের এবোটাবাদে আল-কায়দা নেতা উসামা বিন লাদেনকে হত্যার মাধ্যমে তারা তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ইতি টেনে দিতে পেরেছে বলে মনে করলেও, তারা আগের মতোই শক্তিশালী আছে। যারা সৈন্য প্রত্যাহারের বিপক্ষে মত তুলে ধরেছেন, তারা মনে করেন এখনো তালেবানরা সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত হামলা করে। তাদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা করতে চাইলে অবশ্যই মার্কিন সহায়তা প্রয়োজন নতুবা সম্ভব নয়। আর এভাবে তালেবানদের ছেড়ে দিলে আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেবে। তবে এভাবে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা চলতে থাকলে আফগানিস্তানের সাধারণ নাগরিকরা কখনো শান্তির মুখ দেখবে না। যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটিয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে আসা আর ফুটন্ত গরম তেল থেকে খালি হাতে কোনো কিছু তুলে আনা সমান কথা। সেই কষ্টসাধ্য কাজটিই হতে যাচ্ছে আফগানিস্তানে। তবে এই চুক্তির পরে এবং আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করার পরে, আফগানিস্তানের সাধারণ নাগরিকরা কতটুকু শান্তিতে থাকবে, নারীরা কতটুকু অধিকার পাবে সেটাই চিন্তার বিষয়। তবে মার্কিন-তালেবান এই চুক্তির মাধ্যমে তালেবানদের যে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন হয়েছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। দীর্ঘ দেড় যুগ যুদ্ধ করার পরে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের তালেবানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি এটা তাদের নিশ্চিত পরাজয়। যারা এক সময় তালেবানদের জঙ্গি-সন্ত্রাসী বলেছিল এখন তারাই তাদের মহান যোদ্ধা বলছে। সর্বশেষ, দেখা যাক এই শান্তি চুক্তি কতটুকু কার্যকর এবং কত দূর স্থায়ী হয়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
