শিফারুল শেখ
গত ১৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। এমনকি আমেরিকার নেতৃত্বে গড়ে তোলা ন্যাটো বাহিনীও জানিয়েছে, তারাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব সৈন্য প্রত্যাহার করবে। সময়সীমা চলতি বছরের ১১ সেপ্টেম্বর। এই তারিখটাও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে নাইন ইলেভেন হামলার ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে এদিন। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ঘোষণার পরই বিশ্বে বিভিন্ন দেশে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। অনেকে চিন্তায় পড়েছে আফগানিস্তানকে কী যুক্তরাষ্ট্র তার সেই ‘চরম শত্রু’ তালেবানের হাতেই তুলে দিল? এই দেশে কী আবার শান্তি ফিরবে, না-কি সিরিয়ার মতো গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাবে।
g বাইডেনের সঙ্গে একমত নয়
মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী!
নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত ৬ এপ্রিল ওভাল অফিসে এক নিরাপত্তা ব্রিফিংয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেন জানান, তিনি চান ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে। এই সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড জে অস্টিন (তৃতীয়) এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক এ মিলি উপস্থিত ছিলেন। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বক্তব্য শুনে জেনারেল মার্ক মিলি বলেন, ‘স্যার, আপনার বক্তব্যকে সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নিচ্ছি। তবে সেটা ঠিক হবে মিস্টার প্রেসিডেন্ট?’ গত দুই দশক ধরে আফগানিস্তানে যুদ্ধ চলছে। এর মধ্যে তিন জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিদায় নিয়েছেন। বাইডেন চতুর্থ প্রেসিডেন্ট। এর আগেও মার্কিন সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক নেতাদের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিলেও সবসময়ই চেয়েছে আফগানিস্তানে কিছু সৈন্য অন্তত থাকুক। বিশেষ করে সৈন্য প্রত্যাহারে যেন শর্ত থাকে। কিন্তু বাইডেন তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমনকি সৈন্য প্রত্যাহারে কোনো শর্ত থাকবে না বলেও প্রেসিডেন্ট বাইডেন জানিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন, প্রত্যাহারের সময় তাহলে কখন আসবে? দুই বছর, চার বছর না-কি ১০ বছর পর? তিনি চিরদিনের জন্য আফগানিস্তানে সৈন্য রাখতে রাজি নন।
১৩ এপ্রিল এক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাংবাদিকদের বলেন, প্রেসিডেন্ট (বাইডেন) মনে করেছেন শর্তসাপেক্ষে এগোনো, যা গত দুই দশকে করা হয়েছে, সেটি আফগানিস্তানে চিরদিনের মতো থেকে যাওয়ার একটা রেসিপি।’ যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর কর্মকর্তারা বলছেন, সহিংসতা কমানোর ব্যাপারে তালেবান যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেটা তারা পূরণ করতে পারেনি। এই খবরটি জানাতে গিয়ে এক মার্কিন সিনিয়র কর্মকর্তা বলছেন, তালেবানকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে সৈন্য প্রত্যাহারের এই সময়কালে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা চালানো হলে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তার জবাব দেওয়া হবে। তিনি বলেছেন, তাড়াহুড়ো করে সৈন্য প্রত্যাহারে একটা ঝুঁকি তৈরি করবে বলে প্রেসিডেন্ট বাইডেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এছাড়াও তিনি বলেছেন, পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আফগানিস্তানে ২০ বছর ধরে চলা সংঘাতের এই অধ্যায়টি এখনই বন্ধ করে দেওয়ার সময়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন পহেলা মের মধ্যে সেনা সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বাইডেনের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে অনেক বিশেষজ্ঞ অবাক হয়েছেন, কারণ তারা আশা করেছিলেন বাইডেন ট্রাম্পের নীতি পালটে দেবেন।
g ফিরে দেখা আফগান যুদ্ধ
এটা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধ। ২০০১ সালে নাইন ইলেভেন হামলার পর আফগানিস্তানে গিয়ে তালেবান সরকারকে উত্খাত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এই যুদ্ধে সব পক্ষকেই মূল্য দিতে হয়েছে। সেই মূল্য জীবন দিয়ে, জীবনযাপনে ক্ষতি এবং অর্থমূল্যে শোধ করতে হয়েছে। আফগানিস্তানে যু্দ্ধ করতে এসে ২ হাজার ৪০০ মার্কিন সেনা নিহত এবং ২০ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। এছাড়া ব্রিটেনের ৪৫০ জনের বেশি সেনা নিহত এবং অন্যান্য দেশেরও শতাধিক সেনার প্রাণ গেছে। এই ২০ বছরে ৬০ হাজারের বেশি আফগান সেনাকে জীবন দিতে হয়েছে। বেসামরিক মানুষ নিহতের সংখ্যা এর প্রায় দ্বিগুণ। এতো গেল প্রাণহানির হিসাব। যুদ্ধে অর্থের অপচয়ও হয়েছে যুক্তির হিসাব না মেনে। আফগান যুদ্ধ পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে।
g গৃহযুদ্ধ না শান্তি?
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাতারে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে যে চুক্তি হয় তারপর থেকে আফগানিস্তানে সহিংস হামলা বেড়েছে। তালেবান অবশ্য এসব হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে দেশব্যাপী যুদ্ধবিরতিতে তালেবানের রাজি না হওয়ার বিষয়টি তাদের ইচ্ছা নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ জাগিয়েছে।
তালেবান বলেছে, দেশ থেকে সব বিদেশি সেনা না গেলে তারা ২৪ এপ্রিল থেকে তুরস্কে শুরু হতে যাওয়া শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবে না। তুরস্কে আফগান সম্মেলনের ফলাফল মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি আফগানিস্তানের ভবিষ্যতের উপর কেমন প্রভাব ফেলবে, তা নির্ধারণ করবে বলে ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন কাবুলের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ শফিক হামদাম। তার মতে, সম্মেলনে যদি তালেবান ও অন্যান্য আফগানদের সমন্বয়ে একটি সরকার গঠন সম্ভব হয় তাহলে আফগানিস্তান থেকে দ্রুত সেনা চলে যাওয়ার ক্ষতিটা সামাল দেওয়া যাবে। কিন্তু সম্মেলন ব্যর্থ হলে আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে বলে আমার আশঙ্কা।
কাবুলে ইনস্টিটিউট অফ ওয়ার অ্যান্ড পিস স্টাডিজের নির্বাহী সভাপতি তামিম আসে সতর্ক করে দিয়েছেন, আশা করা যেতে পারে সৈন্য প্রত্যাহারের সময়সীমা ঘোষণায় একটা রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে আফগান দলগুলোর ওপর চাপ তৈরি হবে অথবা সিরিয়ার মতো রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধও শুরু হয়ে যেতে পারে।
আফগানিস্তানে বিবিসির সংবাদদাতা সেকান্দার কেরমানি বলছেন, আফগান সরকার ও তালেবানের মধ্যে যে ধীর গতিতে শান্তি আলোচনা চলছে তাতে মনে হচ্ছে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের আগে তাদের পক্ষে ক্ষমতা ভাগাভাগির কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হবে। তবে অনেকেই আশঙ্কা করছেন তালেবান হয়তো সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে এবং তারপরেই বিজয় অর্জন কিংবা অন্তত আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাবে। সেকান্দার কেরমানি বলেন, তালেবানকে প্রতিহত করতে আফগান সরকার এখনো পর্যন্ত মার্কিন বিমান হামলার ওপর নির্ভরশীল। তবে তালেবান বারবার বলছে যে, তারা ১৯৯২ সালের মতো আর আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ চান না। তারা চান না আফগানিস্তান রাষ্ট্রটি ভেঙে পড়ুক। আবার বিভিন্ন নীতিতে যদি তালেবান তাদের পূর্বের কট্টরপন্থা থেকে সরে আসে তাহলে আফগানিস্তানে সত্যিকারের শান্তি ফিরবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
