করোনা একটি বৈশ্বিক সমস্যা। করোনা ভাইরাসের থাবায় লন্ডভন্ড বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন করোনা পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক থাকার পর দ্বিতীয় বারের মতো এটি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। পুরো বিশ্ব এই ভাইরাসটির কবলে পড়ে অনেকটা অচল হয়ে গিয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে, জীবনাচারে, শিক্ষাক্ষেত্রে, সামাজিক কর্মকাণ্ডে আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছে বিশ্ব মহামারি এই করোনা। বিশ্বের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে প্রভাবশালী দেশগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে সামান্য এই ভাইরাস নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। এসব কিছু কাটিয়ে উঠতে বিশ্ববাসীর হয়তো অনেক সময় লাগতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অসংখ্য মানুষ ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হচ্ছে, লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বাংলাদেশও এসবের বাইরে নয়। ২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ১৮ মার্চ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়, তার পর থেকে সকল শ্রেণির শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে অব্যাহত রাখা হয়। পিএসসি, জেএসসি, এইচএসসি পরীক্ষায় এমনকি সব শ্রেণির সকল শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো অটোপাশ দেওয়া হয়, যা আমাদের সকলের ভবিষ্যতের জন্য বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে একটি মেধাহীন জাতিতে পরিণত হবে আমদের আগামীর ভবিষ্যত্। বর্তমানে অনলাইনে যে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে, এটি কোনোভাবেই আমাদের সাধারণ শিক্ষা কার্যক্রমের মতো হতে পারে না। কারণ সরাসরি শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-শিক্ষক যেভাবে মুখোমুখি জ্ঞান অর্জন বিতরণ করত এখন তা আর সম্ভব নয়। বাংলাদেশ যেহেতু এই পদ্ধতিতে একেবারাই নতুন তাই এই অনলাইন সিস্টেমে রয়েছে নানাবিধ সমস্যা। আমাদের দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ৬৯.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণে অংশ নিতে পারেনি। আমদের পর্যাপ্ত পরিমাণ কম্পিউটার ও ইন্টারনেটে দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকের অভাব রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, মফস্সলের স্কুলগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষায় ডিভাইসের সংকটও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। এমনকি ইন্টারনেট সংযোগ ও পর্যাপ্ত বিদুতের অভাবে ঢাকাতেও অনেক এলাকায় শিক্ষার্থীরা অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাছাড়া আরো অনেক মৌলিক কারণ রয়েছে, যা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নাই আর তা হলো এই করোনাকালীন অর্থনৈতিক অভাবের কারণে অনেকেই শহর থেকে গ্রামে চলে গিয়েছে। যেখানে শহরে থাকতে নানাবিধ সমস্যা ছিল সেখানে একটা শিক্ষার্থী কীভাবে গ্রামে গিয়ে সেই সুযোগ আশা করতে পারে। শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাওয়ার কারণে নতুন নানাবিধ সমস্যা দেখা দেওয়ায় অনেকেই আর স্কুলে ভর্তি হতে পারেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণত আমাদের যেভাবে পাঠ দেওয়া হয়, নতুন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সেগুলোর সুযোগ পাচ্ছে না। বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় সরকার স্কুল খোলার একটি উদ্যোগ নিলেও পরে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
আমাদের সরকার, পরিবার সবাই চায় আমরা সবাই নিরাপদে থাকি। এই সময়ে সবার নিরাপত্তার দিকটাই আগে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, তাই এই পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা থাকলেও তা আর সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের সবাইকেই এখন যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, প্রয়োজনমতো সচেতন থাকতে হবে, প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করতে হবে, সরকারের দেওয়া আদেশ-নিষেধ, লকডাউন, আমাদের কঠোরভাবে মানতে হবে। করোনা পরিস্থিতিতে এপ্রিল মাস বাংলাদেশের জন্য মহাদুর্যোগের মাস। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী গত ১৬ এপ্রিল মৃতের সংখ্যা ১০০ শত ছেড়ে গিয়েছে, যা এই পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেকর্ড। এই পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনায় মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা সত্যি মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। বর্তমান সময়টি আমাদের সবার জন্য ভয়াবহ, আমাদের সচেতনতার মাধ্যমে করোনার সংক্রমণ কমিয়ে এনে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে ফিরে যেতে হবে। আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমকে আরো আধুনিক ও মানসম্পন্ন করার জন্য কিছু প্রস্তাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে, যেমন—অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রমকে আরো আকর্ষণীয় করার পাশাপাশি এবারের বাজেটে গণমুখী ও সবার জন্য শিক্ষা—এই চিন্তা রেখে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিতে হবে। অনলাইনে ক্লাস, পরীক্ষা ও খাতা মূল্যায়নের যে পদ্ধতি এবার প্রয়োগ করা হয়েছে তাতে যেসব ত্রুটিবিচ্যুতি রয়েছে তা আরো উন্নত করতে হবে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়া আনার উদ্যোগ নিতে হবে এবং প্রত্যেক টিভি চ্যানেলে এক ঘণ্টা করে রুটিনমাফিক পাঠদান বাধ্যতামূলক করতে হবে। টাইম শিডিউল পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানিয়ে দিতে হবে। মফস্সলের প্রত্যেকটি স্কুলকে শক্তিশালী মোবাইল নেটওয়ার্কের আয়তায় আনতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই, একবিংশ শতাব্দীর চালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে এবং বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হলে আমাদের শিক্ষার সুযোগ দেবার জন্য সরকার ও আমাদের অভিভাবকমণ্ডলীকে দ্রুত এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে।
n লেখক : শিক্ষার্থী, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ
