বিভুরঞ্জন সরকার

ভুল করার সুযোগ নেই

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২১, ২২:০৪

করোনা ছাড়া গত এক বছরে আর কোনো বিষয় আলোচনায় তেমন গুরুত্ব পায়নি। অপরিচিত এই জীবাণু মানবজাতির এতদিনের অর্জিত জ্ঞানবিজ্ঞানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সংহার করে চলেছে একের পর এক প্রাণ। পৃথিবীর কারোরই কল্পনাতেও ছিল না যে, এমন এক অসহনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। পৃথিবীর সব মানুষ এখন একই সমস্যায় আক্রান্ত, একই আতঙ্কে দিশেহারা, একই অনিশ্চয়তায় বিষণ্ন।

বিপর্যয় হিসেবে কোভিড-১৯ নতুন। আমরা এখনো এই বিপর্যয়কে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। বুঝে উঠতে যে আরো সময় লাগবে, সেটা বুঝতে পারছি। শুরুতে এর কোনো চিকিত্সা ছিল না, ছিল না কোনো প্রতিষেধক। বেশ কিছু দেশে বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে নিমগ্ন থেকে প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কারে সফল হলেও তা এখনো করোনার গতি রোধ করতে পারেনি।

ইতিহাস থেকে আমরা একটা বিষয় জেনেছি, যুদ্ধ বা মহামারির মতো বিপর্যয়ে বহু দেশেরই অর্থনৈতিক গতিপথ সম্পূর্ণ পালটে যেতে পারে। এতদিন যারা জিতেছিল, তারা চলে যেতে পারে পরাজিতের কাতারে। আবার যারা পিছিয়ে ছিল, তারা হয়ে উঠতে পারে নতুন বিজয়ী। এ ক্ষেত্রে কে কীভাবে সেই পরিস্থিতি নিজেদের আয়ত্তে নিতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে এর সফলতা। এই বিপর্যয় সামলে উঠতে আমাদেরও ভাবতে হবে, যতদূর সম্ভব অর্থনীতি এগিয়ে নিতে হবে। দেখতে হবে, সাধারণ মানুষ যেন অনাবশ্যক কষ্ট না পায়। জাতীয় অর্থনীতি কোন পথে যেতে চলেছে, তার প্রাথমিক আভাসকে ভিত্তি ধরে অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করতে হবে। তবে যে সর্বগ্রাসী সংকট ধেয়ে আসছে, সরকারের একক চেষ্টায় তা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। নাগরিক শক্তিকেও এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে নাগরিক সমাজকেও যথাযথ দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে। রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিক শক্তির সহযোগিতার একটি নতুন ধারা গড়ে ওঠার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অবস্থা তৈরি হতে পারে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভাইরাসের সংক্রমণ রোধের ব্যবস্থা করা এবং অর্থনীতিকে চালু রাখার মধ্যে একটা ভারসাম্য তৈরি করা। জীবন ও জীবিকার একটি সুসমন্বয় ঘটাতে হবে। কাজটি সহজ নয়। আমাদের অনেকের মধ্যেই নিয়ম-বিধি না মানার একধরনের উগ্র মানসিকতা রয়েছে। স্বেচ্ছায় নিয়ম না মানলে সব সময় ভয় দেখিয়ে সেটা সম্ভব নয়। করোনা ছড়িয়েছে, ব্যাপকভাবেই ছড়িয়েছে। মাঝখানে একটু বিরতি দিয়ে করোনা আবার ভয়ংকররূপে বিস্তার লাভ করছে। প্রথম দফার চেয়ে দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশে করোনার রুদ্ররূপ দেখা যাচ্ছে। তবে পরিসংখ্যান ইউরোপ বা আমেরিকার সঙ্গে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার ফারাক বিপুল। কেন, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। আফ্রিকা বা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো অবশিষ্ট দুনিয়ার থেকে বিচ্ছিন্ন, সে কথা মোটেই বলা যাবে না। বাংলাদেশিরা দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠীর একটি। ইথিওপিয়ার সঙ্গে চীনের আর্থিক সংযোগ জোরদার। কিন্তু দুটি দেশেই কোভিড-১৯-এ মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম দেখা গেছে। তবে পরিস্থিতি যে এ রকমই থাকবে, সেটা ধরে নেওয়া ভুল হবে। একই রকম ভুল হবে এটা ধরে নেওয়া যে, ইউরোপ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড-১৯ যে পথে চলেছে, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সেই একই ধারায় চলবে। করোনা সব দেশে একই আচরণ করছে না। তবে সংক্রমণ রোধে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, সঙ্গনিরোধ, বিচ্ছিন্ন থাকার মতো স্বাস্থ্যবিধিগুলো কঠোরভাবে মেনে চললে আমাদের দেশের করোনা পরিস্থিতি হয়তো বেসামাল হতো না। কিন্তু আমরা প্রাথমিকভাবেই ধৈর্যের পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছি।

আমরা যা-ই করি না কেন, আমাদের মনে রাখতে হবে দরিদ্র মানুষের কথা, যাদের কোনো সঞ্চয় নেই, বেঁচে থাকার বিকল্প ব্যবস্থা বা উপায় নেই। দীর্ঘস্থায়ী লকডাউন বা অবরুদ্ধ অবস্থার ধকল সহ্য করার সক্ষমতা আমাদের অর্থনীতির নেই। আবার লকডাউন তুলে নিলে করোনার ঝুঁকি মারাত্মক হয়ে দেখা দেওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতাও আমাদের এর মধ্যেই হয়েছে। তাই কী প্রক্রিয়ায় আমরা করোনার বিপদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারব, দেশের আর্থিক নীতি ও জনস্বাস্থ্যের সামনে সেটা একটা মস্ত চ্যালেঞ্জ। শ্রমিকেরা যাতে কাজের জায়গায় যেতে পারেন, কৃষিক্ষেত্রে এবং ছোট ছোট কারখানায় যাতে নির্বিঘ্নে কাজ চলতে পারে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। সব মনোযোগ যেন পোশাকশিল্প বা সংগঠিত খাতের দিকে না থাকে। যাদের কথা বলার সুযোগ নেই, যাদের হয়ে কথা বলার কেউ নেই, তাদের হয়ে তো সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।

দুনিয়াভর যে ওলটপালট চলছে, তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা যদি কোনো ভুল পদক্ষেপ নিই, সেটা সাধারণ ভুল হবে না। সেই ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ মিলবে না। আজকের একটা ভুল পদক্ষেপ স্থির করে দেবে, আগামী কয়েক দশক দেশের অর্থনীতি কোন কক্ষপথে চলবে।

করোনার বিপর্যয়ে গত এক বছরে আমরা কি কিছু শিখতে পেরেছি? আমাদের চোখ থেকে ঠুলি কি খুলতে পেরেছি? আমরা কি আমাদের ভুলগুলো চিহ্নিত করতে পেরেছি? এই সময়টা আসলে সহানুভূতির, সহূদয়তার, ভালোবাসার, বিবেকের। এটা ঠিক যে, করোনা-পরবর্তী পৃথিবী আর আজকের পৃথিবী এক থাকবে না। সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতিতে নানা বাঁকবদল ঘটার সম্ভাবনাই বেশি। আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশেও নতুন পথ খোঁজার চেষ্টা লক্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। চিরাচরিত পন্থায় প্রচলিত কাঠামোর ওপর অল্পবিস্তর প্রসাধনী লেপন করে উত্তরণের পথ খুঁজলে সুফল পাওয়া যাবে না।

এখন পর্যন্ত দেশের রাজনীতির হাল ধরে আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বেই সবকিছু চলছে। মানুষের আশা-ভরসা শুধু তার ওপরই। দেশে কার্যকর বিরোধী দল নেই। একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি সম্ভবত সরকারও চায় না। তবে গণতন্ত্রের জন্য এটা খুব স্বাস্থ্যকর অবস্থা নয়। প্রধানমন্ত্রীর একক কর্তৃত্বের শাসন সরকারের জন্য স্বস্তিকর হলেও এটা প্রকৃত গণতন্ত্রকামীদের শিরপীড়ার কারণ। এটা মজবুত কাঠামো নয়। প্রধানমন্ত্রীও নিশ্চয়ই সেটা বোঝেন। আবার নিজের অসহায়ত্বও তিনি বোঝেন। তার দল এবং সহযোগী নেতৃত্বের দুর্বলতাও তার অজানা নয়। তিনি ছাড়া আর সবাইকে কেনা যায়—এমন খেদোক্তি তার নিজের। তার চারপাশে কাজের লোক কম। নানা ধান্ধার লোক বেশি। ‘আমি কি পাব’, ‘ও পেয়েছে আমি কেন পাব না’—এই মনোভাব যাদের, তাদের দূর না করলে ‘পাওয়া’ ও ‘খাওয়া’র প্রতিযোগিতায় সব বরবাদ হয়ে যাবে। হয়তো এর মধ্যে তা অনেকাংশে গেছেও।

যেসব সুবিধাভোগী মন্ত্রী, এমপি, নেতাদের করোনাকালে মানুষের পাশে দেখা যায়নি, তাদের সবাইকে পরবর্তী সময়ে রাজনীতি থেকেও নিরাপদ দূরত্বেই রাখতে হবে। বিশাল দল আওয়ামী লীগের দাপুটে সব নেতা কোথায়? এত বড় দলে এত এত নেতা থাকতে সচিবদের কেন জেলার সমন্বয়কের দায়িত্ব দিতে হয়েছিল? এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। ক্রান্তিকালে যদি প্রধানমন্ত্রীর হাতকে তারা শক্তিশালী করতে না পারেন, তাহলে এই সুবিধাভোগীরা দেশের বা দলের কী কাজে লাগবেন? প্রধানমন্ত্রীকে ভেবে দেখতে হবে, মুখোশে ঢাকা মুখ নিয়ে তিনি কত দিন চলবেন।

ব্যর্থতা, দলবাজি, দুর্নীতির অভিযোগ শাসকদের বিরুদ্ধে থাকে। বড় বিপর্যয় হলে কাদা ছোড়াছুড়িও রাজনীতির চিরকালীন বৈশিষ্ট্য। তবে ত্রাণ বিতরণে দুর্নীতিমুক্ত থাকার জন্য বিতরণব্যবস্থায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের যুক্ত করতে হবে। স্বচ্ছতা সুশাসনের প্রধান শর্ত। কোন শ্রেণির মানুষকে, কোন খাতে কত সাহায্য করা হচ্ছে, তা গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রচার করা উচিত। সন্দেহবাদীরা যাতে সত্যাসত্য যাচাই করতে পারে।

খাদ্য জনগণের মূল চাহিদা। তাই চাল থেকেই মতলবি রাজনীতি সস্তা ‘ভিটামিন’ সংগ্রহ করে থাকে। তাই চাল নিয়ে সামান্য অনিয়মও প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। আবার দলের যেসব অর্বাচীন নেতাকর্মী ত্রাণসহায়তা কিংবা ধান কাটার নামে ‘হাইস্যকর’ ফটোসেশন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন তথ্য গোপন করা কঠিন, সবার হাতে হাতে এখন মোবাইল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অতিসক্রিয়। তথ্যের অত্যাচারে মাথা গুলিয়ে যাওয়ার অবস্থা। মানুষের অনাহারে থাকার নাটুকে ভিডিও ভাইরাল হতে পারে। বাসন্তী নাটকের কথা মনে রাখতে হবে। রাজনীতি এমন এক সামাজিক ব্যবস্থা, যা দুর্যোগেও থেমে থাকে না। মাথা গলানোর ছিদ্র বের করতে যারা সক্রিয়, তাদের প্রতিহত করার প্রজ্ঞা যিনি দেখাতে পারবেন, তিনিই তো আগামীর রাজনীতির কান্ডারি হবেন।

n লেখক :জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক