করোনা আক্রান্ত হয়ে ১৬ এপ্রিল ঢাকাই সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেত্রী ‘মিষ্টি মেয়ে’ খ্যাত নায়িকা ও রাজনীতিক কবরীর মৃত্যুর শোক না কাটতেই পরদিন সুপারস্টার ওয়াসিমের চলে যাওয়া বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে চলচ্চিত্রাঙ্গনকে। তার একদিন পর করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন দেশের আরেক গুণী অভিনেতা এস এম মহসীন। গুণী এই তিন অভিনেতা-অভিনেত্রীর জীবন ও কর্ম নিয়ে লিখেছেন
ফয়জুল আল আমীন
সারাহ বেগম কবরী
করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ১৩ দিনের মাথায় ঢাকাই সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী ১৬ এপ্রিল চলে যান না ফেরার দেশে।
কবরীর জন্ম ১৯৫২ সালের ১৯ জুলাই। বাবা কৃষ্ণদাস পাল। মা শ্রীমতী লাবণ্য প্রভা পাল। তার বাবার দুই বিয়ে। ছোট স্ত্রীর দ্বিতীয় মেয়ে মিনা পাল (কবরী)। কবরী নিজেকে খুব অল্প বয়সেই আলাদা করেছেন—নিজ গুণে। ১৯৬৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে উঠেছিলেন তিনি। কাজ করেন টেলিভিশনে। এরপর দ্রুত সময়ে যুক্ত হন চলচ্চিত্রে এবং হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি।
কবরীর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়— ১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ ছবির মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্র পায় নতুন তারকা কবরীকে। এতে নির্মাতা-নায়কের বিপরীতে কাজ করেন নায়িকা কবরী। বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সম্মাননা লাভ করেছিল এটি। ১৯৬৫ সালে ফ্রাংকফুট চলচ্চিত্র উত্সবে দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কার পায় ছবিটি। আর দেশীয় দর্শকের কাছে কবরী রোমান্টিকতার নতুন নাম হয়ে ওঠেন। ছবিটির মাধ্যমেই তিনি পরিচিতি পান ‘মিষ্টি মেয়ে’ খ্যাতি। রাজ্জাক ও কবরী অভিনীত ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবির সব গান ‘হিট’ তকমা পেয়েছিল। ‘রংবাজ’ ছবিতেও এ জুটি দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিতে কবরী রাজার ঝি চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেন। অনেকের মতে, কবরীর ‘কবরী’ হয়ে ওঠার পেছনে এ ছবিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ‘মাসুদ রানা’ ছবিতে সোহেল রানার বিপরীতে ছিলেন অলিভিয়া ও কবরী। ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কবরী-ফারুক অভিনীত ‘সুজন সখী’ ছবিটিকে বাংলা ভাষার সেরা রোমান্টিক পিস হিসেবে ধরা হয়। রাজু সিরাজের ‘আরাধনা’ মুক্তি পায় ১৯৭৯ সালে। এতে বুলবুল আহমেদের বিপরীতে কবরী মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ে রুপার ভূমিকায় অভিনয় করেন। চাষী নজরুল ইসলামের কালজয়ী ছবি ‘দেবদাস’-এ পার্বতী হিসেবে হাজির হয়েছিলেন কবরী। ‘সারেং বউ’ উপন্যাস ও চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে নারীর সংগ্রাম। যা সার্থকভাবে ফুটিয়ে তোলেন কবরী। এর মাধ্যমেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের স্বাদ পান কবরী। ২০০৬ সালে ‘আয়না’ নির্মাণ করে কবরী প্রমাণ করেন, পর্দা শাসন করা এই নেত্রী পর্দার পেছনেও সমান সাবলীল। ছবিটির মাধ্যমে সোহানা সাবাকে প্রথম বড়পর্দায় তুলে ধরেন কবরী; এতে সাবার বিপরীতে ছিলেন ফেরদৌস। ২০২০ সালে ফের উদ্যোগ নেন নির্মাণের। নাম ‘এই তুমি সেই তুমি’। এর শুটিং পুরোপুরি শেষ করেছিলেন কবরী। চলছিল ডাবিং ও সম্পাদনার কাজ। যদিও ছবিটির শেষ দেখে যেতে পারলেন না কবরী।
ওয়াসিম (মেজবাহ উদ্দীন আহমেদ)
ঢাকাই সিনেমার এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা ওয়াসিম ১৭ এপ্রিল দিবাগত রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
১৯৫০ সালের ২৩ মার্চ চাঁদপুর জেলার আমিরাবাদে জন্মগ্রহণ করেন ওয়াসিম। তার পারিবারিক নাম মেজবাহ উদ্দীন আহমেদ। ওয়াসিম ইতিহাস বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি বডিবিল্ডিংয়ের জন্য ‘মি. ইস্ট পাকিস্তান’ খেতাব অর্জন করেন। ওয়াসিমের চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়েছিল ১৯৭২ সালে ‘ছন্দ হারিয়ে গেল’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে। ১৯৭৪ সালে ‘রাতের পর দিন’ চলচ্চিত্রে প্রথম নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ তার। চলচ্চিত্রটির অসামান্য সাফল্যে রাতারাতি সুপারস্টার বনে যান তিনি। ১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া ওয়াসিম অভিনীত ‘দি রেইন’ তাকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়। বিশ্বের ৪৬টি দেশে এটি মুক্তি পেয়েছিল। ছবিটি বাম্পার হিট হয় আর ওয়াসিমকে অভিনেতা হিসেবে পৌঁছে দেয় অনন্য উচ্চতায়। শাবানা, ববিতা, কবরী, সুচরিতা, অঞ্জু ঘোষ ও নূতনদের সঙ্গে তার জুটি ছিল প্রশংসিত। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দেড় শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন ওয়াসিম। ২০০৯ সালের পর সিনেমা থেকে নিজেকে আড়াল করে নেন এ সুপারস্টার। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি প্রযোজনাও করেছেন। তার প্রযোজিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘হিসাব চাই’, ‘মোহন বাঁশি’, ‘নয়া তুফান’ ইত্যাদি।
এস এম মোহসীন
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১৮ এপ্রিল চলে গেলেন দেশের গুণী অভিনেতা এস এম মোহসীন।
তিনি এক সময় শিক্ষকতায় পুরোদমে সময় দিলেও শেষ সময়ে এসে আগের মতো সময় দিতে পারতেন না। কারণ পেশা হিসেবে অভিনয়ই ছিল তার সব। এক সময়ের শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এস এম মোহসীন মোহসীনের অভিনয়ের শুরুটা স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে থেকেই টিভিতে ও রেডিওতে। তবে আব্দুস সাত্তারের লেখা ও আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় নির্মিত ‘রক্তে ভেজা শাপলা’ টেলিভিশনে তার প্রথম উল্লেখযোগ্য নাটক এবং রেডিওতে তার প্রথম উল্লেখযোগ্য নাটক হচ্ছে (মুক্তিযুদ্ধের পর) ‘পদক্ষেপ’। তিনি মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’, ‘চিঠি’সহ আরো বেশকিছু নাটকে অভিনয় করেছেন। ‘ড্রামা সার্কেল’র হয়ে বহুদিন তিনি মঞ্চে অভিনয় করেছেন। বিদেশে তার অভিনীত প্রথম মঞ্চ নাটক ‘কেউ কিছু বলতে পারে না’; এটি ১৯৭২ সালে কলকাতায় মঞ্চস্থ হয়। ২০১৮ সালে বাংলা একাডেমির সম্মানীত ফেলো লাভ করেন তিনি। অভিনয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে।
