ক্ষমতার লোভ, নিজের পেশাগত জায়গাটি শক্ত করা কিংবা রাজনৈতিক খুঁটির প্রয়োজন—এমন সব কারণেই আজ অনেকেরই রাজনীতিতে আসা—কেন যেন এমনই মনে হয় আজকের দিনের পৃথিবীব্যাপি দেখা রাজনীতির গতিবিধি বিশ্লেষণে। সেবা কিংবা আদর্শ বাদই দেওয়া যায়। কেননা, সেগুলো নিয়ে ভাবার লোকজন এখন আর বড় বেশি দেখা যায় না। এ তো গেল রাজনীতিতে আসার কারণ বিশ্লেষণের দিক। কিন্তু আসার পরের দিকটাও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নিতে পারলে কিছুটা হলেও ভুলে থাকা যেত আসার কারণগুলো। কিন্তু তা হচ্ছে না। পেশাটাকে সত্ভাবে গণ্য করার লক্ষণও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। তাই তাদের কাছে জনগণ, জনসেবা, রাষ্ট্রসেবা—এ সবকিছুই মুখ্য চিন্তার বিষয় থেকে দূরে থাকে। ব্যক্তিস্বার্থের কাছে হার মানে এসব কিতাবি শব্দ। একটি দেশের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা বজায় আছে কি না, রোজগারের হার বাড়ছে কি না, শিক্ষার মান বাড়ছে কি না, স্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছে কি না—এগুলো নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কোথায়! কিন্তু সমাজজীবনে রাজনীতিবিদদের এমন সব গুণের প্রয়োজনের বিষয় অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। মানুষের মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা তৈরি করার কাজটি রাজনীতিবিদদেরই দায়িত্ব। কিন্তু সে দায়িত্ব নিয়ে কজন রাজনীতিবিদ মাথা ঘামায় আজকের দিনে! তারা তো ব্যস্ত হয় নিজের স্বার্থে অথবা সম্প্রদায়গত রাজনীতির গোড়াপত্তনে। এসবের ভয়াবহ পরিণাম যে এসব রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকেরা বোঝেন না, তা কিন্তু নয়। ক্ষমতার অঙ্ক তাদের শুভবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে রাখে। তাতে কিছু মানুষকে কিছু সময়ের জন্য হয়তো প্ররোচিতও করা যায়, কিন্তু দিনের শেষে তা থেকে চরম পরিণতির দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। গণতন্ত্রের দুনিয়ায় ভোটের রাজনীতি সব সময়ই অনিশ্চয়তায় ভরা। গণতন্ত্রের মহিমায় শাসকপক্ষ কখনো বিরোধী হয়ে যায়, কখনো বিরোধীরা শাসকের চেয়ারে বসে পড়ে। এসব হলো গণতান্ত্রিক রাজনীতির সহজ হিসাবের অঙ্ক। কিন্তু সংকীর্ণ স্বার্থে সমাজটাকে ভেঙে দেওয়ার বিষ ছড়িয়ে যদি কেউ ক্ষমতায় আসে, তাকে কিন্তু ভাঙা আয়নায় খণ্ডিত অবয়বটুকুই দেখতে হয়। সেখানে মনুষ্যত্বের সলিল সমাধি ঘটলে মানুষ ডুবে যায়। সেই মানুষের মধ্যে ধর্ম ভেদাভেদ থাকে না।
বাংলাদেশের কথা যতি বলি, বহু বছরের লালিত লোকজ ধর্ম বাংলার ঘরে ঘরে আলো দিয়েছিল একসময়। জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সম্প্রীতির বন্ধনকে দৃঢ় করেছিল বাংলার লোকজ সংস্কৃতি। লোকজ সংস্কৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাউল সংস্কৃতি। দীর্ঘ ইতিহাসের হাত ধরে আসা লৌকিক চেতনার এই বাউল উন্মেষ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, এখানে মানুষ মিশে যেত মনুষ্যত্বের চেতনায়। এখানে হিন্দুদের দুর্গাপূজায় সাহায্য করে কিংবা হিন্দুর শবদেহ কাঁধে করে শ্মশানে পৌঁছে দেয় মুসলমান। এখানে মুসলমানের উত্সবে যোগ দেয় হিন্দু। পিরের দরগায় হিন্দুবাড়ির মেয়েরা প্রথম সিন্নি চড়ান, মোমবাতি জ্বালান। মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিনের ‘হারামনি দ্বিতীয় খণ্ড’-এর ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘এদেশে অধিকাংশ মুসলমানই বংশগত জাতিতে হিন্দু, ধর্মগত জাতিতে মুসলমান।’ তাই বাংলায় সৃষ্টি হয়েছে হিন্দু-মুসলমানের লোকসম্পর্কের দৃঢ়বদ্ধ শেকড়। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কারণে ধর্মে ধর্মে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধিয়ে রাখতে চায় অপশক্তি। লোকসংস্কৃতির শক্ত শিকড়ে বাঁধা বাঙালিকে সঠিক পথে চালানোর দায়িত্ব ছিল যাদের সবচেয়ে বেশি, সেই তারাই যেন আজ দিশেহারা—হয় নিজ স্বার্থে অথবা বিভ্রান্তে।
সাম্প্রতিককালে নানা দেশের রাজনীতির চরিত্রে চমকপ্রদ পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। এ বিষয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ সৃষ্টি করেছে কয়েকটি দেশ ও আমেরিকা। আমেরিকার কথাই ধরি। অরাজনৈতিক স্বভাবের প্রতিমূর্তি হিসেবে রাজনীতিতে অবতীর্ণ হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন লোক কী করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারে, তা গোটা দুনিয়াকে অবাক করে দিয়েছে। অশ্বেতাঙ্গ, অভিবাসী, নারী, শ্রমজীবী—বিভিন্ন শ্রেণির প্রতি বিদ্বেষের বাতাবরণ ক্রমশই আমেরিকায় বহু লোকের স্বীকৃতি পেয়েছে; আগে যে হিংস্রতার প্রকাশ ভাবাও যেত না, সেটা ক্রমশ দৈনন্দিন ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকান সাংবাদিক অ্যান্ড্রু মারানজ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এ বিবর্তনের অসামান্য বিবরণ দিয়েছেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনের দিন নর্থ ক্যারোলিনা প্রদেশের একটি ছোট্ট গির্জার বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সেখানেই একটি ভোটকেন্দ্র হয়েছে। রাস্তার ধারে এক প্রবীণ কৃষ্ণাঙ্গ—নাম ল্যারি, একটি ফ্লায়ার বিলি করছিলেন। বাইশ বছর তিনি আমেরিকার সেনাবাহিনীতে ছিলেন। উত্সাহীদের মধ্যে গল্পের ছলে তিনি বলছিলেন, ‘আমি চাইব না ঐ উন্মাদ লোকটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হোক, কিন্তু আমার মনে কারো প্রতি কোনো ঘৃণা নেই।’ এরই মধ্যে গির্জা থেকে বেরিয়ে এলেন এক শ্বেতাঙ্গ যুবক। পার্কিং লটের দিকে যেতে যেতে তিনি ঐ কালো মানুষটির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে স্বগতোক্তির ঢঙে একটা লম্বা লেকচার দিলেন। তার বলার সারমর্ম—দেশটা তো শ্বেতাঙ্গদেরই। অন্যরা সেখানে আছে, থাকুক; কিন্তু সত্যি কথাটা এবার তাদের সাফ সাফ শুনিয়ে দেওয়া দরকার। ল্যারি মাটির দিকে তাকিয়ে চুপ করে শুনলেন লোকটির লেকচার। লোকটি চলে যাওয়ার পর বললেন, ‘গত বিশ-ত্রিশ বছরে কখনো রাস্তাঘাটে এরকম কথা শুনিনি। এখন ওরা হঠাত্ ভাবছে, এগুলো জোরে জোরে বলা যায়।’
এমন পরিবর্তন শুধু আমেরিকা বা ভারতেই নয়, বাংলাদেশেও হয়েছে। চরম বিদ্বেষের প্রবক্তারা দেখতে দেখতে রাজনীতির মধ্যমঞ্চে বিরাজমান হয়েছে। এই সেদিনও যাদের ‘একস্ট্রা এলিমেন্ট’ ভাবা হতো, তারা এখন রীতিমতো ‘মেইনস্ট্রিম’। বিশ বছর আগেও এদেশে যা প্রকাশ্যে বলার কথা কেউ ভাবতে পারত না, এখন তা বারবার উচ্চারণ করা হচ্ছে। সবকিছু যেন পালটে গেছে। নিজের সম্প্রদায়গত পরিচয়ের ঠুলিই যেন চোখে এঁটে নিয়েছি আমরা! অন্য সব পরিচয়, সব সমস্যা, সব প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। সমাজের মনটা অনেকটা শেয়ারবাজারের মতো। সবাইকে যদি বিশ্বাস করানো যায় যে শেয়ারের দাম বাড়বে, তবে শেয়ারের দাম সত্যিই বাড়ে। এমন প্রচেষ্টাই চলছে এখন বাংলাদেশে। আর এখানেই স্বার্থান্বেষীদের হাতে পরাস্ত হচ্ছে রাজনীতিবিদেরা। তারা যেন অসহায় হয়ে পড়েছেন। দিকনির্দেশনা দিতে ভুলে গেছে তারা যেন হঠাত্ করে। আর সে কারণেই আমাদের যত মাথাব্যথা। নিশ্চিত এবং নিশ্চিন্ত থাকার কোনো অবকাশ নেই আমাদের। মানুষকে ভাগ করার দুরভিসন্ধি সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করা প্রয়োজন। মানসিক মেরুকরণের উর্বর জমি আমাদের সমাজ। সেখানে বিদ্বেষের বীজ ছড়িয়ে বিষবৃক্ষের বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা করছে অন্ধকারের কারবারিরা। এখন দেখার পালা, আমরা তা কতটা প্রতিহত করতে সক্ষম হই। অ্যান্ড্রু মারানজ তার বইয়ের উপসংহারে লিখেছেন, ‘অন্ধকারের কারবারিরা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু তারা ব্যর্থ হবে কিনা তা নির্ভর করছে আমাদের ওপর। ইতিহাসের বঙ্কিম পথটির গতি ন্যায়ের দিকে নিজে নিজে ঘোরে না, আমাদেরই তা ঘোরাতে হবে।’
ঠিক ৫০ বছর আগে, ১৯৭১-এর মার্চ মাসে, এক বসন্তে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালির আবাসস্থল লাল হয়ে উঠেছিল। কৃষ্ণচূড়া বা পলাশে নয়—মানুষের রক্তে। বুড়ো, বাচ্চা, মেয়েরা হাতে-কাঁধে-মাথায় যে যতটুকু পেরেছে, সংসারের জিনিস নিয়ে ছুটে চলেছে। সেই শঙ্কিত মানুষের পদযাত্রা আজও মনে আছে। সেই উদ্বাস্তু মিছিল রূপ নিয়েছিল উদ্বাস্তুবন্যায়। দেখেছিলাম এক পরিবারকে। ঢাকার শাঁখারীবাজার থেকে জিঞ্জিরা হয়ে ১৫ মাইল রাস্তা পার হয়ে এসেছেন পায়ে হেঁটে। মৃত্যুভয়ে ভুলে গিয়েছিলেন পরিবারের মেয়েটির পায়ে লাগা গুলির কথা। বাঁ পায়ের গোড়ালির খানিকটা ভেদ করে গুলিটি এদিক থেকে ওদিকে চলে গিয়েছে। মেয়েটি তা টেরই পায়নি। একসময় রক্তও শেষ হয়ে এসেছিল, শুকিয়ে গিয়েছিল ক্ষত জায়গাটি। সেই রক্ত হিন্দুর না মুসলমানের, তা জানার জন্য কোনো প্রশ্ন ছিল না তখন। কেউ তা ভাবেনি আলাদা করে। তবে সন্দেহ নেই, মাঝেমধ্যেই তার বিচ্যুতি ঘটেছে—নীতিগত ভুলও হয়েছে। কিন্তু মোটের ওপর বাংলাদেশে প্রগতিশীল ট্র্যাডিশন বজায় থেকেছে সব সময়ই। তাই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আশার আলো দেখার সুযোগ এখনো আছে। যারা ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতি ছড়াচ্ছে, তাদের গলার জোর অনেক বেশি। কিন্তু তারা সংখ্যায় কম। বাংলাদেশ বর্তমানে একটি যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলার লোকজ সংস্কৃতিকে আবার পাখা মেলে ধরার সুযোগ দিতে হবে। পথিকবর, চৈত্রের পলাশ বা কৃষ্ণচূড়া দেখলে দাঁড়িয়ে যেও। স্মরণ কোরো ১৯৭১-এর গণহত্যার কথা, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিহতের কথা, ধর্মনিরপেক্ষ দেশ গড়ার কথা। যারা বাঙালিকে মানুষ ভাবে না, বাঙালি ভাবে না—ভাবে নিছক একটি সাম্প্রদায়িক জীব, তাদের প্রচেষ্টা সফল হতে দিও না বাংলার লোকজ সংস্কৃতির সেবকেরা।
n লেখক :কলাম লেখক
