শিক্ষার ক্ষতি কাটানোই বড় চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২১, ২২:৫১

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও বড় ধরনের আঘাত এসেছে। আগামী ২৩ মে পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে ২৪ মে স্কুল খুলবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি ২৪ মে খুলে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি হবে ৪৩০ দিন পর, অর্থাত্ এক বছরেরও বেশি সময় পর। তবে হঠাত্ করে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এটিও অনেকটা অনিশ্চিত। তাহলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার কী হবে?

আয়শা গত শিক্ষাবর্ষে রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। ১৭ মার্চ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাতে গোনা কয়েক দিন স্কুলে যেতে পেরেছিল। আয়েশা এখন দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। কোনো লেখাপড়া না করে, পরীক্ষা না দিয়েও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ওঠে সে। আর দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়েও স্কুলে যেতে পারেনি। এ বছর আদৌ যেতে পারবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কিত তারা বাবা-মা। হয়তো পড়াশোনা না করে কোনো পরীক্ষা না দিয়েই তৃতীয় শ্রেণিতে উঠবে। তাহলে আয়শা কী শিখল? রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. জসীম উদ্দিনের মতে, শিক্ষার্থীদের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিকের ভিত্তি দুর্বল হলে এর প্রভাব পড়বে ভবিষ্যতে। তাই এসব শিক্ষার্থীকে নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী হবে, সে বিষয়ে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে এ নিয়ে গবেষণাও হতে পারে। এসব শিক্ষার্থীর ক্ষতি কাটানোই হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ঘরবন্দি শিশুরা গত বছরের পাঠ্যসূচির অনেক কিছুই রপ্ত করতে পারেনি। চলতি শিক্ষাবর্ষেও যদি একই অবস্থা হয়, তাহলে কীভাবে এই ক্ষতি পোষানো হবে? তবে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন অনেক শিক্ষাবিদ।

তথ্য অনুযায়ী, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সংগত ও যৌক্তিক কারণেই বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে টেলিভিশন, অনলাইন, বেতার ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পড়াশোনা চালু রাখতে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তার খুব একটা সুফল আসেনি বলে মনে করেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতির পাশাপাশি মানসিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এই ক্ষতির প্রভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে বলে মনে করেন আমিরুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক।

শিক্ষাবিদ মাছুম বিল্লাহর মতে, বিদ্যালয়ে পারস্পরিক যে আত্মিক যোগাযোগ, মন খুলে কথা বলা, দুষ্টুমি করা, একত্রে পাঠগ্রহণ করার মধ্যে যে চঞ্চলতা রয়েছে, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোয় ছয় শতাধিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়া হবে ২৪ মে। ১৭ মে হল খোলা হবে। প্রথম বর্ষে ভর্তি নেওয়া যায়নি যথাসময়ে। যদিও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আবার কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক সংকটে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় টিউশন ফি আদায় নেই। ফলে শিক্ষক-কমকর্তাদের বেতন-ভাতা, বাড়িভাড়াও দিতে পারছে না। এমপিওবিহীন বেসরকারি স্কুল-কলেজের অবস্থাও শোচনীয় পর্যায়ে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কিন্ডারগার্টেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে সরকারের নানামুখী পরিকল্পনাও ছিল। শিক্ষকদের টিকা দেওয়া এবং পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও টিকা দেওয়ার কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠান খোলার পর চলতি বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পাঠদান শুরুর চিন্তা ছিল। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অন্যান্য ক্লাসও শুরু করার প্রস্তুতি ছিল। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ গেটে হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ নতুন করে ওয়াশ ব্লক নির্মাণ করা হয়েছে, রাখা হয়েছে ফাস্ট এইড বক্স। কিন্তু করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি।

অন্যদিকে প্রয়োজনীয় ডিভাইসের অভাব, দুর্বল ও ধীরগতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তির উচ্চমূল্যের কারণে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর পক্ষেই অনলাইনে ক্লাস করা সম্ভব হচ্ছে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নতুন ব্যাচের ভর্তিও পিছিয়ে গেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে বাসার কাজ হিসেবে অ্যাসাইনমেন্টের সঙ্গে ভার্চুয়ালি নানা ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। শিক্ষকেরা এসব প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করবেন। এর মাধ্যমে নানান ধরনের পুরস্কার ও মূল্যায়ন করা হবে। বিগত সময়ে আলাদাভাবে এ ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেগুলো আবারও সমন্বিতভাবে চলতি সপ্তাহে এসংক্রান্ত নতুন নির্দেশনা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে বাসায় বসে থেকে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরো বেশি সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। শিক্ষকেরা যাতে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মোবাইল ফোন ও ভার্চুয়াল মাধ্যমে যোগাযোগ বাড়ান, সেই নির্দেশনা দেওয়া হবে।

অন্যদিকে প্রাথমিকের পাঠপরিকল্পনায় পরিবর্তন আসছে। এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (ন্যাপ) কাজ করছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে এক দিন স্কুলশিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে অভিভাবকদের কাছে ওয়ার্কশিট দেবেন। পরবর্তী সপ্তাহে তা জমা নিয়ে নতুন ওয়ার্কশিট দেবেন। প্রাথমিক বইয়ের প্রতি অধ্যায় শেষে বা বইয়ের মধ্যে যে ওয়ার্কশিট দেওয়া আছে, সেগুলো ফটোকপি করে অভিভাবকদের দেওয়া হবে।