অলসের অজুহাত

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২১, ২১:৩৬

অমিত কুমার কুণ্ডু

অনেক অনেক দিন আগের কথা। এক গাঁয়ে চমচম বাবু নামে এক জমিদার ছিলেন। চমচম বাবুর লাড্ডু কুমার নামে এক নাদুসনুদুস ছেলে ছিল। ছেলেটির ভাগ্যে বড়ো বিশ্বাস ছিল। অনেকেরই একটুআধটু ভাগ্যে বিশ্বাস থাকে, তবে এতটা বিশ্বাস ভালো নয়। বিশেষ করে কেউ যদি সব সময় বলে—ভাগ্যে যা আছে তা-ই হবে। ‘কপালের লিখন, না যায় খণ্ডন।’ ‘মুখ দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি।’ সবসময় এ ধরনের চিন্তা করা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। সে খুব একটা কাজও করত না। সারাদিন শুয়ে বসেই কাটিয়ে দিত। কেউ যদি বলত, তোর চলবে কী করে? তাহলে চোখ বুজে বলত, যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই চালাবেন।

এভাবে বেশ কিছুদিন চলল। পিতার লেখাপড়া শেখানোর সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে লাড্ডু কুমার কৈশোর পার হয়ে যৌবনে পা দিল। বড়ো হলেও তার চিন্তাচেতনার কোনো পরিবর্তন হলো না। এতে করে খুব বেশি চিন্তিত হয়ে পড়লেন লাড্ডু কুমারের বাবা, জমিদার চমচম বাবু। অনেক কবিরাজ দেখানো হলো। অনেক বদ্যির কাছে যাওয়া হলো। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না।

জমিদার বাবু যখন ছেলেকে নিয়ে কী করবেন কিছুতেই ভেবে উঠতে পারছিলেন না, তখন হঠাত্ই এক বুদ্ধি এল মাথায়। তিনি তার পরিকল্পনার কথা কাকপক্ষিকেও জানতে দিলেন না। জমিদার মহলের কেউ সেটা বুঝে উঠতেও পারল না।

চমচম বাবুর ছেলে লাড্ডু কুমার নৌকা ভ্রমণ পছন্দ করলেও সাঁতার জানত না। যতবার জমিদার বাবু সাঁতার শেখার কথা বলেছেন, নদীতে ডুবে যাবার কথা বলেছেন, ততবার লাড্ডু কুমার ভাগ্যের দোহাই দিয়েছে। ছড়া কেটে বলেছে— ‘কপালে থাকলে ঘি, না খেয়ে করব কী?’

একদিন চমচম বাবু লাড্ডু কুমারকে নিয়ে নৌকায় উঠলেন। নবগঙ্গা নদী। নদীর দুইধার ঘন সবুজে ঢাকা। নদীতে প্রচুর স্রোত। মাঝেমধ্যে দু-একটা মাছধরা নৌকা দেখা যাচ্ছে। চমচম বাবু ও লাড্ডু কুমারের গল্প চলছে। গল্পে গল্পে কিছুদূর যাওয়ার পর, যখন লাড্ডু কুমার গল্পে মশগুল তখন জমিদার বাবু কৌশলে ছেলেকে নদীতে ফেলে দিলেন।

একে তো লাড্ডু কুমার সাঁতার জানে না তারপর মাঝনদী। নদীতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে চিত্কার শুরু করল। বারবার বলতে লাগল, বাঁচাও, বাঁচাও। আর হাত-পা দাপাতে শুরু করল। চমচম বাবু তাকে না তুলে বলতে লাগলেন—আমি বাঁচাবার কে বাবা, তোমার কপালে যা আছে তা-ই হবে। তুমি এ নিয়ে চিন্তা কোরো না।

বাবার এমন কথা শুনে ছেলেটি হাবুডুবু খেতে খেতে বলতে লাগল—বাবা, তুমি কি আমাকে মেরে ফেলতে চাও? এখানে কপালের দোহাই দিচ্ছ কেন? তুমি আমাকে সাহায্য না করলে, আমি উঠব কী করে?

তখন জমিদার বাবু বললেন—তা হলে বলছ, সবসময় কপালের দোহাই দিয়ে কাজ হয় না। লাড্ডু কুমার হাঁসফাঁস করতে করতে বলল, হ্যাঁ বলছি, এখন তো তুমি আমাকে বাঁচাও।

চমচম বাবু বললেন—ঠিক আছে তোমাকে বাঁচাব, তার আগে তুমি বলো, তুমি সব কিছু ভাগ্যের নামে ছেড়ে না দিয়ে নিজে কিছু করবে। পড়াশোনা শিখে বিদ্বান হবে। বাবার এমন উক্তি শোনার পর লাড্ডু কুমার হাবুডুবু খেতে খেতে প্রতিশ্রুতি দিল কিছু করার, সঙ্গে সঙ্গে এও বলল, এভাবে আর কখনো অজুহাত দেবে না।

কথা শেষ হতে না হতেই জমিদার বাবু লাড্ডু কুমারকে নৌকায় তুলে নিল। এই শিক্ষা পাবার পর লাড্ডু কুমারের জীবনে আমূল পরিবর্তন এল। সে নিজেই পণ্ডিতের বাড়ি যেতে আরম্ভ করল। সাহিত্য, সমাজ আর শাস্ত্রের নানা বিষয়ে জ্ঞান নিতে শুরু করল। শহর থেকে বিভিন্ন বিষয়ের বই আনিয়ে নিজের বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করল পাঠাগার। সেখানে পড়ুয়ারা বিনামূল্যে বই পড়ার সুযোগ পেল। লাড্ডু কুমারের লেখাপড়া, সমাজের কাজ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল, সেভাবে তার বসয়ও বাড়ছিল। পিতা চমচম বাবু তার জন্য পাত্রী খুুঁজতে শুরু করলেন।

একদিন শুভলগ্নে মহাধুমধামে লবঙ্গলতিকার সঙ্গে লাড্ডু কুমারের বিয়ে হয়ে গেল। লবঙ্গলতিকা বিয়ের আগে কিছু লেখাপড়া করেছিল। লাড্ডু কুমার লবঙ্গলতিকাকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করল মেয়েদের একটি স্কুল। দিনে দিনে তাদের গ্রাম হয়ে উঠল নতুন আলোয় আলোকিত।

মানুষ ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন আর সাহিত্য পাঠ করে নিজেকে নতুনভাবে চিনতে শিখল। এ এক নতুন গ্রাম। এ এক নতুন লাড্ডু কুমার। যে লাড্ডু কুমার আর কখনো  বলে না—ভাগ্যে যা আছে তা-ই হবে। বলে না—‘মুখ দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি’। বরং নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে, নিজের চেষ্টায় কিছু করে। নিজে অপরকে বাঁচায়। নিজে লেখাপড়া শিখে সত্যিকার মানুষ হয়ে ওঠে। অপরকে সত্যিকার মানুষ হবার পথ দেখায়।