স্বাস্থ্য বিমার নাম শুনে প্রচন্ড জ্বর, ঘন ঘন বমি ও মূত্রনালির সংক্রমণে মুমূর্ষু রোগীকে ভর্তি নেয়নি পশ্চিম বঙ্গের কলকাতার চারটি নামকরা বেসরকারি হাসপাতাল। সোমবার (২৮ জানুয়ারি) রাতভর মরণাপন্ন বাবাকে চারটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তির চেষ্টায় ব্যার্থ হওয়ার পর মঙ্গলবার (২৯ জানুয়ারি) সকালে এনআরএস হাসপাতালে বাবাকে ভর্তি করিয়েছেন সাব-ইন্সপেক্টর তাপস ঘোষ।
তাপসের অভিযোগ, সব জায়গাতেই প্রথমে বলা হয় বেড আছে। কিন্তু রোগীর সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের আওতায় বিনাপয়সায় চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে শুনেই বলে দেওয়া হয়, বেড নেই। কোনো কারণ ছাড়াই মুমূর্ষু ওই রোগীকে ভর্তি নিতে অস্বীকার করে হাসপাতালগুলো। মোট চারটি বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে মুমূর্ষু রোগী ভর্তি না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে মেডিকা হাসপাতালের পক্ষ থেকে সন্ধ্যা সুতোদিয়া জানান, 'অন্য হাসপাতালের কথা তিনি বলতে পারবেন না। তবে তারা কোন রোগীকে ফেরান না। এ রকম কিছু হলে, নিতান্তই বেড না থাকার কারণেই হয়ে থাকতে পারে'। অন্য দুই হাসপাতাল 'ডিসান' ও 'ফর্টিস' হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
সাব-ইন্সপেক্টর তাপস ঘোষ উত্তর ২৪ পরগনার মিনাখাঁ থানায় কর্মরত রয়েছেন। তার বাড়ি নবদ্বীপে। সম্প্রতি তাপসের বাবা মধু ঘোষ মূত্রনালির সংক্রমণে অসুস্থ হয়ে পড়ায় প্রথমে তাকে নবদ্বীপ হাসপাতালে ভর্তি করেন পরিবারের লোকজন। সোমবার ওই হাসপাতাল থেকে তাকে রেফার করা হয় কলকাতায়। রাত সাড়ে নয়টার দিকে মধুবাবুকে নিয়ে কলকাতায় রওনা দেন পরিবারের লোকজন। রাত একটার দিকে কলকাতায় পৌঁছে প্রথমেই মধু ঘোষকে নেওয়া হয় কলকাতা বাইপাসের কাছের ফর্টিস হাসপাতালে। তাপসের অভিযোগ, 'প্রথমে কিছুই বলা হয়নি। কিন্তু সরকারি স্বাস্থ্য বিমার কথা শুনেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেন, বেড নেই'। তবে ওই হাসপাতালের রাসবিহারী শাখায় ভর্তি হওয়ার সুযোগ আছে বলে জানানো হয় তাপসকে।
পরবর্তীতে মুমূর্ষু বাবাকে নিয়ে তারা পৌঁছান রাসবিহারীতে। কিন্তু সেখানেও বিমার কথা শোনার পর বেড নেই বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয় রোগীকে। সেখান থেকে এর সহকর্মীকে ফোন করলে তারা রোগীকে ডিনাসে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
পরে রোগীকে ডিনাসে নেওয়ার অভিজ্ঞতা জানান তাপস। তিনি বলেন, 'ডিসানের অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। সেখানে রোগীকে প্রথমে এমার্জেন্সিতে ভর্তি নেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিমার কথা শুনেই রাত সাড়ে তিনটার দিকে বেঁকে বসে এই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। প্রথমে বলা হয়, কয়েক দিন ধরে রাজ্য সরকারের হেল্থ স্কিমে ক্যাশলেসে কিছু সমস্যা হচ্ছে। তাই নগদে চিকিৎসা করতে হবে। বাবার কথা ভেবে এতেই রাজি হয়ে যাই। তখন তারা একটি ফর্ম দেয়। যেটি আসলে একটি বন্ড। যাতে আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া হয়, ক্যাশলেস চিকিৎসার আওতায় হলেও আমি নগদে চিকিৎসা করাব। তাতেই সই করে দিই। কিন্তু তার পরও কিছুক্ষণ টালবাহানার পর হাসপাতালের কর্মীরা জানিয়ে দেন, নগদেও চিকিৎসা করতে পারবে না তারা। এর কোন নির্দিষ্ট কারণ জানায় নি তারা'। তাপসের অভিযোগ, 'এমার্জেন্সিতে কার্যত বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখা হয়েছিল দুইঘণ্টা। সামান্য জ্বরের ওষুধ ছাড়া কিছুই দেওয়া হয়নি রোগীকে'।
আরও পড়ুন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সভায় ‘সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ পদক্ষেপ উপস্থাপন
এরপর বাবাকে ডিনাসে রেখেই তাপস যান মেডিকা হাসপাতালে। তার দাবি, সেখানেও প্রায় একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি। প্রথমে সব কিছু জানার পর চিকিৎসায় রাজি হলেও বিমার নাম শোনার পর তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। এরপর আবার ফর্টিস হাসপাতালেও যান তাপস, কিন্তু কর্তৃপক্ষের উত্তর ছিল একই। তিনি বলেন, 'এ ভাবে চলতে চলতে সকাল হয়ে যায়। তার পর বাধ্য হয়ে এনআরএস হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে বাবাকে ভর্তি করি। সেখানে আপাতত চিকিৎসা শুরু হয়েছে'।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে চিকিৎসাকে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তারপরও রোগীকে প্রত্যাখ্যানের অভিযোগ উঠল ডিসান, মেডিকা ও ফর্টিস হাসপাতালের বিরুদ্ধে। ভর্তি করার কথা বলেও সরকারি স্বাস্থ্য বিমার কথা শুনেই ফিরিয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
ইত্তেফাক/জেডএইচডি
