করোনায় হূদেরাগীদের করণীয়

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২১, ২২:৩০

 ‘আপনার রোগী জনাব নুর সাহেব গতকাল মারা গেছেন’ মোবাইল ফোনে মেসেজটা পেয়েই মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। জনাব নূরের বয়স ৬৫ বছর, বনানীতে বিশাল একটা বাড়িতে সাত-আট জন স্টাফ নিয়ে থাকেন। ভদ্রলোক বিপত্নীক এবং সন্তানরাও বিদেশে স্থায়ীভাবে প্রবাসী। হার্টের সমস্যা ধরা পড়লে দুই বছর আগে আমি তার হার্টে স্ট্যান্টিং করাই।

নুর সাহেব গত ১০-১২ দিন ধরে হালকা জ্বর আর কাশিতে ভুগছিলেন। তার বাসার প্রায় সব কর্মচারীরও একই অবস্থা। কেউ করোনা টেস্ট করায়নি, কোনো চিকিত্সক দেখায়নি, এমনকি তার ব্যক্তিগত চিকিত্সক হিসেবে আমাকে জানানোর প্রয়োজনও মনে করেননি। দুই দিন আগে ভদ্রলোকের ভাই তার বাসায় গেলে পুরো ব্যাপারটা জানতে পারেন। নিজে উদ্যোগী হয়ে তিনি সবার করোনা টেস্ট করালেন এবং রাতের মধ্যেই সবার কোভিড পজিটিভ পেলেন। পরদিন সকালে নুর সাহেবের শ্বাসকষ্টের খবর পেয়ে দ্রুত তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। কর্তব্যরত চিকিত্সক জানালেন, বড্ড দেরি হয়ে গেছে, ৮০ শতাংশ ফুসফুস আক্রান্ত। আইসিইউতে রাতেই ভদ্রলোক সবাইকে ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন। ভদ্রলোক হার্টের রোগী এবং মৃত্যুর কারণ করোনা ভাইরাস।

হূদেরাগ ও কোভিড-১৯

রোগ প্রতিরোধক্ষমতা মোটামুটি ঠিক থাকলে আর পাঁচ জনের যতটুকু ভয়, হূদেরাগীদের ভয়ও প্রায় ততটুকুই। তবে কোভিডে আক্রান্ত হলে হূদেরাগীদের জটিলতা বেশি। সে কারণে যে মাত্রার সংক্রমণ একজন কমবয়সি ও সুস্থ-সবল মানুষ অবলীলায় সামলে নিতে পারেন, সেই একই সংক্রমণ জটিল হূদেরাগীদের ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

হূদেরাগীদের কেন এত ভয়?

‘আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি’ রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, সাধারণ কোভিড রোগীদের মধ্যে যেখানে মৃত্যুহার ২ দশমিক ৩ শতাংশ, হূদেরাগ আছে এমন কোভিড রোগীর ক্ষেত্রে তা পৌঁছে যায় ১০ দশমিক ৫ শতাংশে। ৬৫-এর চেয়ে বেশি বয়সি মানুষের মধ্যে মৃত্যুহার ১০ শতাংশ, বয়স বেশি নয় কিন্তু করোনারি আর্টারি ডিজিজ আছে এমন রোগীদের মধ্যে মৃত্যুহার ১০ দশমিক ২ শতাংশ, হার্ট ফেইলিওরের রোগীদের ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ, অ্যারিদমিয়ার রোগীদের মধ্যে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। চীনের একটি হাসপাতালে সমীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেন, হূদেরাগ আছে এমন কোভিড রোগী, যাদের রক্তে ট্রোপোনিন লেভেল বাড়েনি, তাদের মৃত্যুহার যেখানে ১৩ শতাংশ, যাদের ট্রোপোনিন বেড়েছে তাদের মৃত্যুহার হয়ে গেছে ৬৯ শতাংশ। ট্রোপোনিন হলো সেই কার্ডিয়াক এনজাইম, যা হার্টের পেশি ক্ষতিগ্রস্ত কি না, তা নির্দেশ করে এবং যার মাত্রা হার্টের পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে। অর্থাত্, কোভিডের প্রভাবে হার্টের ক্ষতি হয়।

কোভিড রোগে হার্টের কী কী ক্ষতি হতে পারে?

১. মায়োকার্ডাইটিস-করোনা ভাইরাস হার্টের পেশিতে সংক্রমণ ছড়ায়, যাকে বলে মায়োকার্ডাইটিস। মায়োকার্ডাইটিসে হার্টের পাম্প করার ক্ষমতা কমে গিয়ে হার্ট ফেইলিওর হতে পারে। বাড়াবাড়ি হলে রোগী মারাও যেতে পারে। ২। অনিয়ন্ত্রিত হূত্স্পন্দন (এরিদমিয়া) : কোভিডের কারণে কারো হূত্স্পন্দন খুব কমে যায়, কারো খুব বেড়ে যায়। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এরিদমিয়ার কারণে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ৩. হার্ট অ্যাটাক-পূর্ব থেকেই কারো হার্টে ব্লক থাকলে সেখান থেকে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। আবার রক্ত ঘন হয়ে রক্তনালি বন্ধ হয়েও হতে পারে।  ৪. করোনা রোগীদের আরেকটি খারাপ দিক হলো রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা। শরীরের রক্ত তরল অবস্থায় রক্তনালির মধ্য দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। রক্ত ঘন হয়ে জমাট বেঁধে গেলে শরীরের বিভিন্ন অংশে জটিলতা দেখা দেয়। এর মধ্যে ফুসফুস ও হার্টের রক্তনালি বন্ধ হয়ে হঠাত্ প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে মৃত্যু তার ভয়াবহ উদাহরণ।

করোনায় আক্রান্ত হূদেরাগীর সাবধানতা : হার্টের জন্য যে সমস্ত ওষুধ খেতে হয়, তা নিয়মিত খেয়ে যেতে হবে। বাড়িতে কারো জ্বর-সর্দি-কাশি হলে তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন। দরকার না হলে বাড়ির বাইরে বের হবেন না। মাস্ক ব্যবহার, হাত ধোওয়া ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম মেনে চলুন। শরীরচর্চা বন্ধ করবেন না। সামান্য কাশি, জ্বর, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, খাবারে অরুচি, নাকে ঘ্রাণ না পাওয়া ইত্যাদি হলেই আপনার চিকিত্সককে জানান। কোভিড পরীক্ষা করুন, নিয়মিত পালস অক্সিমিটারে অক্সিজেনের মাত্রা রেকর্ড করুন। শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকলে অথবা অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে অতি দ্রুত নিকটস্থ হাসাপাতালে যোগাযোগ করুন।

চিকিত্সকদের প্রতি অনুরোধ : হার্টের রোগীদের প্রতি অতিরিক্ত যত্ন নিন। এদের পূর্বের হার্টের ওসুধ বন্ধ করবেন না। Inj Enoxaparine ৬০ সম, সঙ্গে Tab Rivaroxaban ১০ বা ২০ সম দিতে ভুলবেন না। Tab Rivaroxaban ১০ সম ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে। কারণ অনেক রোগী সুস্থ হওয়ার পরেও রক্ত জমাট বাঁধার কারণে বিভিন্ন সমস্যায় ভুগে থাকে। এমনকি সুস্থ হয়ে বাসায় চলে যাওয়ার পরেও হঠাত্ মৃত্যু হতে পারে।

সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন, করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকুন। নিজে বাঁচুন এবং আপনার প্রিয়জনকে বাঁচতে দিন।

n লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, হূদেরাগ বিভাগ, জাতীয় হূদেরাগ ইনস্টিটিউট ও হাসাপাতাল, ঢাকা