#মি টু

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:১৫

পৃথিবীব্যাপি নারীকে যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনসম্মুখে বলে বেড়ানোর সাহস ক’বছর আগেও ভাবা যেতো না। পারিবারিক মানসম্মান কিংবা সামাজিক অবস্থান, প্রতিপক্ষের হুমকি ইত্যাদি কারণে যেখানে অধিকাংশ নারী নির্যাতনই ঘটনার অন্তরালে থেকে যেতো, সেখানে ‘#মি টু আন্দোলন’ নারীকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা যুগিয়েছে। পৃথিবীব্যাপি আলোচিত ‘#মি টু’ আন্দোলন

নিয়ে লিখেছেন— সৈয়দা সাহেরীন

#মি টু’র ধারণাটা ১৯৯৭ সালের দিকে। সমাজকর্মী টারানা বার্ক তের বছরের এক কিশোরীর মুখে নির্যাতনের কথা শুনে নিজেকেও তার সাথে মেলাতে থাকেন। যেরকম নির্যাতন তার সাথেও হয়েছিল। আর সেখান থেকেই ‘#মি টু’ শব্দের উত্পত্তি। যার দ্বারা বোঝাত ‘আমিও’ যৌন হেনস্তার শিকার। ‘#মি টু’ আন্দোলন বার্কের হাত ধরে ২০০৬ সালে শুরু হলেও বার্ক কৃষ্ণাঙ্গ ছিলেন বলে এটা তেমন একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। গেল অক্টোবরের দিকে হলিউডের প্রযোজক হারভে উইনস্টেইনের বিরুদ্ধে মডেল অভিনেত্রী আলিসা মিলানো ‘#মি টু’ দিয়ে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ্যে তুলে ধরলে ‘#মি টু আন্দোলন’ মুহূর্তেই পৃথিবীব্যাপি ছড়িয়ে পড়ে।

এ আন্দোলনের জনপ্রিয়তার মূলে ছিল নারীর বলতে না পারার কষ্ট। ফলে ‘#মি টু’ এর তীরে বিদ্ধ হতে হয়েছে ছাত্রী কর্তৃক শিক্ষককে, ঊর্ধ্বতন কর্তা কর্তৃক অধঃস্তনকে, শিল্প-সাহিত্যের পুরোহিতদের, পত্রিকা কিংবা চলচ্চিত্র পাড়ার গুণীজনকে। বেরিয়েছে প্রকাশ্য সুন্দরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য পুরুষ মানসের কুিসত রূপ।

‘মি টু হ্যাশট্যাগের অবস্থান জানতে গুগল ট্রেন্ডিং  ‘#মি টু রাইজিং’ নামে একটি ‘ডেটা ভিস্যুয়ালাইজেশন ম্যাপ’ তৈরি করে। মার্কিন নারীবাদী কবি মিউরিয়েল রুকেসারের একটি উদ্ধৃতি গুগল ব্যবহার করে এই ম্যাপে। উদ্ধৃতিটি হলো— ‘যদি একজন নারী তার জীবনের সত্য প্রকাশ করে, তাহলে কী ঘটবে? দুনিয়া দুই ভাগ হয়ে যাবে।’ মজার বিষয় হলো ম্যাপটিতে সার্চ দিলে ঠিক তেমনটাই মনে হচ্ছিল। সারা পৃথিবীজুড়ে মি টু হ্যাশট্যাগে জ্বলজ্বল করছিল। এ আন্দোলন নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়াতে কাঠমাণ্ডু, করাচী, রাওয়ালপিন্ডি, লাহোর এবং ইসলামাবাদও ছিল।

বাংলাদেশেও ‘#মি টু’ আলোচিত হয়। আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশী-বংশোদ্ভূত মডেল, অভিনেত্রী ও পাইলট মাকসুদা আখতার প্রিয়তি প্রথম বাংলাদেশে মি টু হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে। গেলো ২৯ অক্টোবর প্রিয়তি একটি পোস্টের মাধ্যমে রঙধনু শিল্প গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম কর্তৃক ২০১৫ সালে এক যৌন নির্যাতনের কথা ফাঁস করে। মুহূর্তেই বিষয়টি আলোচিত হয়। একে একে আরো অনেকেই মি টু হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে তাদের সাথে ঘটে যাওয়া যৌন নির্যাতনের কথা ফাঁস করতে থাকে। নারী অধিকারকর্মীরা এ ঘটনায় হাজার বছরের বাঙালি নারীদের ট্যাবু ভেঙ্গে মুখ খোলার জন্য সাধুবাদ জানায়।

তবে বাংলাদেশে ‘#মি টু’ আন্দোলন এখনো উপযোগী নয় বলে অনেক নারী মনে করে। তাদের মতে, ভারত বা কোথাও ‘#মি টু’ আন্দোলন আদতে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। এটা কেবল সাময়িক তোলপাড়ই তৈরি করে।

যদিও ভরসার বিষয় হলো গত গোল্ডেন  গ্লোব অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় মার্কিন টিভি উপস্থাপিকা ওপেরাহ উইনফ্রে আশা রেখে বলেছিল যেহেতু এই হ্যাশট্যাগ বহু নামীদামী ব্যক্তিত্বের উপর আঘাত করেছে ফলে, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এ সমস্যাটি এ হ্যাশট্যাগের ফলে একটা সমাধানে আসবে বলে আশা করা যায়। এখন তবে অপেক্ষার পালা।