জাপানি প্রবাদে আছে- বাঁশের নল দিয়ে পুরো আকাশ দেখা যায় না। এই প্রবাদটি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি জাপানে যাওয়ার পরই। সেই দিন আকাশ পরিভ্রমণের আকাঙ্ক্ষায় স্বপ্নের ডানায় ভর দিয়ে পাড়ি জমিয়ে ছিলাম সূর্যোদয়ের দেশ জাপানে। জাপান সরকারের অনুদানে সার্ক অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর কিছু শিক্ষার্থী গত বছর জেনেসিস-এর হাত ধরে ডিসেম্বরের ১০ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত ঘুরে এলাম জাপান থেকে। প্রিয় বিদ্যাপীঠ ঢাকা হলিক্রস কলেজের সহযোগিতায় দেখে এলাম সূর্যোদয়ের দেশ, জেনে এলাম প্রযুক্তির বিস্ময়। যাওয়ার পর সেখানের হিমশীতল আবহাওয়ায়, স্নিগ্ধ হূদয়ের মানুষগুলোর, উষ্ণ অভ্যর্থনায় জীবনের কাঁটাগুলো যেন গোলাপ হয়ে ধরা দিয়েছে।
প্রারম্ভে আমরা Western Chiba Prefectural Disaster Prevention Center-এ যাই। সেখানে আমরা বিভিন্ন মাত্রার ভূমিকম্প এবং টাইফুনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে করণীয় সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। দ্বিতীয় দিন আমরা জাপান প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরি অ্যাসোসিয়েশন ও চিবা ইউনিভার্সিটিতে যাই। সেখানে গিয়ে সত্যিই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কৃষিক্ষেত্রে তাদের ব্যবহূত অভিনব এবং চমকপ্রদ পদ্ধতিগুলো অসাধারণ ও অভাবনীয়। তৃতীয় দিনে আমরা সেখানকার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাই। যেখানের শিক্ষার্থীরা আমাদেরকে ধানের খড় দিয়ে অভিনব কিছু জিনিস বানানো শেখায় এবং অসাধারণ কিছু উপহার দেয়। আমরা তাদের বাংলাদেশের পতাকা, ঐতিহ্যবাহী কিছু খাবার উপহার হিসেবে দেই এবং তাদের প্রধান শিক্ষককে, লাইব্রেরিতে রাখার জন্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চিত্রসহ নানাবিধ ঘটনাবলির একটি বই উপহার হিসেবে প্রদান করে আসি। তারপর আমরা বুলেট ট্রেনে করে হোস্ট ফ্যামিলির সাথে দেখা করতে গিয়েছি। হোমস্টে-এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল জাপানকে তার নিজের মানুষের মতো করে দেখা। তার অভ্যন্তরীণ জীবনকে জানা। কিন্তু সেই জীবনকে জানতে গিয়েই গড়ে ওঠে আত্মার সম্পর্ক। পরের দিন আরো একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হয় আমাদের। সেখানে গিয়ে আমরা শিক্ষার্থীদের সাথে কয়েকটি জাপানিজ ট্রেডিশনাল গেইম খেলেছি। একই দিনে হাকউবা ভিলেজে গিয়ে তাদের মেয়রের সাথে দেখা করি আমরা। চতুর্থ দিন যা ধাকোই অ্যাপোল স্টোরটিং সেন্টার, ওমাচি রিসাইকেল পার্ক, মাটসোমটো ক্যাস্টল, ডিও অয়াসবি ফার্মে গিয়ে জাপানের অসাধারণ প্রযুক্তির প্রয়োগ দেখে বুঝতে পেরেছি যে তারা কতটা উন্নত। তারপর অপরাহ্নের ফেয়ার ওয়েল পার্টিতে প্রত্যেক দেশ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি নাচ-গানের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছে। হাতে বাংলাদেশের পতাকা, মনে বাঙালির চেতনা, বাজছে বাংলা গান আর তার সাথে পায়ে ঘুঙুর বেঁধে আমরা ক’জন মালদ্বীপ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভুটানসহ জাপানের শখানেক মানুষের মাঝে বাংলার সংস্কৃতির ছাপ রেখে যাওয়ার প্রচেষ্টা করেছি।
