নিয়ম-নীতির বিরুদ্ধে যাওয়াটাকে সাধারণভাবে অনৈতিকতা বলে। প্রতিটি সমাজ বা রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-নীতি থাকে, আর প্রত্যেক নাগরিককেই সেই সব নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হয়। কেউ সেই সব নিয়ম-নীতির বিরুদ্ধাচরণ করলে সেটাকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়, আর সেই ব্যক্তিকে অপরাধী সব্যস্ত করা হয়। মানুষ অপরাধ কেন করে? এই প্রশ্নের উত্তরে যে কেউই চট করে বলে দেবে, ‘সমাজে পর্যাপ্ত শাস্তির অভাব, সুশিক্ষার অভাব, নৈতিক অবক্ষয়, সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের অন্ধ ভালোবাসা বা বিশ্বাস, বেকারত্ব ইত্যাদি।
একেক অপরাধের জন্য দায়ী একেক কারণ। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক অপরাধের পেছনে থাকে অনেক কারণ। অপরাধীর অপরাধের পেছনে সাইকোলজিক্যাল বিভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জননী’ উপন্যাসে তিনি ‘বিধান’ চরিত্রের শৈশব বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘বিধানের পশু-পাখির প্রতি ছিল অগাধ মমতা, কিন্তু বিপরীত দিকে ছিল নির্মমতা। প্রথমে সে অপার যত্নে পশু-পাখি পালন করত এবং তারপর আবার সেই পশু-পাখিগুলোকে নির্মম-নৃশংস এবং অসম্ভব যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করত।’ বিধানের এই বৈশিষ্ট্য শুধু উপন্যাসেই আবদ্ধ নয়, বাস্তব জীবনেও পরিলক্ষিত হয়। আমরা আমাদের আশেপাশে যদি ভালোভাবে লক্ষ করি, তাহলে অবশ্যই এর অসংখ্য উদাহরণ খুঁজে পাব। দেখা যাবে, কেউ একজন খুব সখ করে কোনো পশু-পাখি পালন করল এবং পরে সেগুলো নৃশংসভাবে হত্যা করল। নিউরোসায়েন্স বা স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কিউট আগ্রাশন’ বলে।
মানুষ বেশি সুন্দর কোনো বস্তুকে সহ্য করতে পারে না। অধিক সুন্দর কোনো জিনিস দেখলে ‘অ্যাড্রোনালিন’, ‘ডোপামিন’ ও ‘সেরেটোনিন’ নামক নিউরোট্রান্সমিটারের অস্বাভাবিক ক্ষরণের কারণে সৃষ্ট হওয়া প্রভাব মানুষ সহ্য করতে পারে না। ফলে মানুষ সেই সুন্দর বস্তুকে ধ্বংস করে ফেলতে চায়। স্যার সিগমুন্ড ফ্রয়েড তার সাইকো এনালাইসিস সম্পর্কিত গবেষণায় মানুষের বেড়ে ওঠার জীবনকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছিলেন। এগুলো হলো যথা—ইড, ইগো ও সুপার ইগো। ফ্রয়েড মনে করেন, শৈশবে সব শিশু ‘ইড’ নামক বিশেষ এক স্বভাবের মধ্য দিয়ে যায়। এক্ষেত্রে শিশুর মনে ‘প্লেসার প্রিন্সিপাল’ বা ‘আনন্দের নিয়ম’ কাজ করে। অর্থাত্, শিশু যা করে আনন্দ পাবে, সে তা-ই করবে। এরকম সময় শিশুরা খুব পাশবিক হয়ে ওঠে। পিঁপড়ে পিশে মেরে ফেলা, ফড়িং কিংবা প্রজাপতির পা অথবা ডানা টেনে ছিঁড়ে ফেলা, কুকুর-বিড়াল দেখলে পাথর ছুড়ে মেরে তারা একধরনের পাশবিক আনন্দ পায়। এ থেকে বোঝা যায়, অপরাধ করাটা মানুষের মধ্যে জন্মগতভাবেই থাকে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কারো মধ্যে এটা স্থায়ী হয় আর কারো মধ্যে তা সুপ্ত হতে থাকে।
ক্রিমিনাল সাইকোলজি বলে, অপরাধ করা একটি নেশার মতো, সহজে এর মাদকতা মন থেকে চলে যেতে চায় না। পৃথিবীর সব থেকে নিকৃষ্টমানের সিরিয়াল কিলার টেডবান্ডি খুন করাটাকে গর্বের কাজ বলে মনে করত এবং সে এটাকে খেলার মতো দেখত।
এখন প্রশ্ন হতে পারে, যদি অপরাধের পেছনে মানব মস্তিষ্ক ও মনোবিজ্ঞানের হস্তক্ষেপ হয়ে থাকে, তাহলে অপরাধীর দোষ কী? অপরাধী তো শুধু তার মস্তিষ্কের নির্ধারিত কাজগুলোই করছে। এখানে একটি চিরন্তন সত্য কথা না উল্লেখ করলেই নয়, মানুষ চাইলেই তার মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মানব মস্তিষ্কের ‘এমিগডালা’ ও ফ্রন্টাল লোবের সামনে থাকা ‘প্রি-ফ্রন্টাল কোর্টেক্স’ প্রধানত বিচার-বিবেচনা করতে সাহায্য করে। অর্থাত্, মানুষকে উচিত-অনুচিত কাজের মধ্যে পার্থক্য করতে সাহায্য করে। আর উচিত-অনুচিত কাজ কোনগুলো তা বাহ্যিক দিক থেকে নির্ধারণ করে সমাজব্যবস্থা। সমাজব্যবস্থা যত সুশীল-সাবলীল-সুগঠিত হয়, মানুষ ও মানব মস্তিষ্ক তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। ফলে মানব মস্তিষ্ক কোনো অপকর্মের নির্দেশ প্রদানের আগে সমাজে প্রচলিত আইনের কথা আগে ভাববে এবং অপকর্মে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম
