৫৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) অভ্যন্তরে একসময় প্রবহমান ছিল অর্ধশত খাল। এসব খাল দিয়ে চলত যাত্রীবাহী গয়না ও বজরা (পুরোনো দিনের বিশেষ নৌযান), পণ্যবাহী নৌকা-ট্রলার। কীর্তনখোলা নদীর জোয়ার-ভাটা এবং নির্মল পরিবেশের কারণে সুখ্যাতি ছিল বরিশালের। খালের নামেও বরিশালের অনেক এলাকার নামকরণ হয়েছে। কিন্তু দখলদারদের হাতে দখল হতে হতে এখন খাল নেই, রয়ে গেছে শুধু নাম।
কাগজে-কলমে বর্তমানে ৪৬টি খাল থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ খালেরই অস্তিত্ব নেই। চার বছর পূর্বে তত্কালীন জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় কয়েকটি খাল রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তার কোনো সুফল পায়নি নগরবাসী। প্রবহমান খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হাজা-মজায় পরিণত হওয়ায় বর্ষায় পানি জমে থাকছে। এতে খালগুলো থেকে রোগ-জীবাণু ছড়াচ্ছে।
এসব খাল রক্ষায় বরিশাল সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র যোগদানের পর নানান উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। প্রাথমিক ভাবে এসব খাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে আরো গতি ফেরাতে মাসব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। গতকাল সোমবার বেলা ১১টায় নগরীর চৌমাথা বাজারসংলগ্ন নবগ্রাম খালের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উদ্বোধন করেন মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। উদ্বোধন শেষে মেয়র বলেন, বরিশালের খালগুলোর বেশির ভাগ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অনেক খাল নাব্য হারিয়েছে। কোনোটা অবৈধভাবে দখল হয়ে গেছে। খাল সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় বর্ষার সময় কিংবা জোয়ারের পানি প্রবেশ করলে নগরীর বিশাল এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। হাঁটু পানির নিচে থাকে বিভিন্ন এলাকা। এ কারণে নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষায় এবার বর্ষার আগেই খালগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
এ সময় সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে মেয়র জানান, গুরুত্বপূর্ণ ২৬টি খাল পুনঃখনন, তীর সংরক্ষণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। ঐ প্রকল্প পাশ হলেই কার্যক্রম শুরু হবে এবং পালটে যাবে নগরীর চিত্র। উদ্বোধনকালে বরিশালের জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দীন হায়দার এবং সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফারুক হোসেনসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, দখলদারদের হাতে দখল হতে হতে এখন খাল নেই, রয়ে গেছে শুধু নাম। কলেজ রোর খাল, ভাটার খাল, জেলখাল, সাগরদী খাল, বটতলা খাল, নাপিতখালী খাল, টিয়াখালী খাল, নথুল্লাবাদ খালসহ নগরীর এসব খাল এখন ইতিহাস। নগরীর প্রবীণরা জানান, প্রশাসন বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে কোনো কোনো খালের কিছু অংশ অবৈধ দখলমুক্ত করলেও খালের পুরোনো চেহারা ফিরছে না। এমনকি জোয়ার-ভাটায়ও পানি প্রবাহ হচ্ছে না এসব খালে। খালগুলো দখল-ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতি বছর বর্ষায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। সচেতন মহল আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যত্ বিনির্মাণে খালগুলো পুনঃখনন ও অবৈধ দখলমুক্ত করে খালগুলোর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অর্ধশত এসব খালের অধিকাংশ স্থানেই রয়েছে দখলদারদের দৌরাত্ম্য। বরিশাল নগরীর রূপাতলী বটতলা মোড় মসজিদসংলগ্ন চক্রবর্তীর খাল ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরুর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। সাগরদী খালের দুই পাশে এমনভাবে দখল করা হয়েছে যে, বোঝার উপায় নেই এটি খাল ছিল। লাকুটিয়া খালসহ কাজীপাড়া, জিয়া সড়ক, আমানতগঞ্জ, নবগ্রাম, কাশীপুর, চাঁদমারী, পলাশপুর খালও ফের ভরাট ও দখল হয়ে যাচ্ছে।
