বাজেট :আকারে বাড়লেও বাস্তবায়নে গতি বাড়েনি

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২১, ২৩:০০

কোভিড মহামারির মধ্যেও আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের আকার বাড়ছে। প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন ধরে তৈরি হচ্ছে ভর্তুকি ও থোক বরাদ্দভিত্তিক নতুন বাজেট। আকারে বাড়লেও বাংলাদেশে ঘোষিত বাজেটই নয়, সংশোধিত বাজেটও বাস্তবায়ন হয়নি কখনো।

যদিও বিশেষজ্ঞরা সব সময়ই বাজেটের আকারের বদলে গুণগত ব্যয়ের বিষয়টিকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছেন। তাদের মতে, শুধু আকার বাড়িয়ে লাভ কী, যদি তা বাস্তবায়ন করা না যায়? বরং খাতভিত্তিক ফোকাস দিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য একটি বাজেটই অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সহায়ক। সংশোধিত বাজেটও শতভাগ বাস্তবায়নের রেকর্ড না থাকায় ব্যয়ের প্রত্যাশিত সুফলও মিলছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, চাহিদার নিরিখে বাজেট দেওয়া হলে বাস্তবায়নেও তেমনি গুরুত্ব থাকতে হবে। ব্যয়ের সক্ষমতা অর্জনে কেন পিছিয়ে থাকা, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজা দরকার এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। নইলে অর্থবছরের শুরুতে যতটা না প্রত্যাশার কথা বলা হোক, বাস্তবায়ন না হওয়ায় জনগণের কাছে বিষয়টি গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। চলতি বছরেও একই অবস্থা হবে, কারণ করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে অর্থনীতি আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত  হয়েছে।

বাজেট বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে দক্ষতা ও সমন্বয়হীনতার অভাবকে দায়ী করা হলেও বিগত কয়েক বছর ধরে এ দুটো খাতে বেশ কাজ হয়েছে। তথাপি বাস্তবায়ন হয়নি শতভাগ। কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করতে না পারলে অন্য প্রকল্পে টাকা স্থানান্তরের নিয়মও করা হয়েছে। কিন্তু বছর শেষে এ কাজেও ততটা সুফল মেলে না। বরং বছরের শেষ দিকে এসে টাকা ফেরত দিতেও অনীহা কোনো কোনো মন্ত্রণালয় ও বিভাগের। তাতে পরবর্তী বছরের বরাদ্দ কমে যেতে পারে, তাই মার্চ মাস পেরোলেই অনুমোদন নিয়ে কোনো রকম একটি ব্যয়কাঠামো তৈরি করা হয়। বাস্তবে কাজ হয় না। সূত্রমতে, এ ধরনের ফাঁকফোকর থাকার পরও বাজেটের বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। গত এক দশকে ২০১০-১১ অর্থবছরেই বাজেটের বাস্তবায়ন তুলনামূলক বেড়েছে, কিন্তু শতভাগ হয়নি। সরকারি হিসাবেই গত ১০ বছরের সংশোধিত বাজেট বাস্তবায়নের হার গড়ে ৭০ শতাংশের কম হয়েছে। যদিও এর গুণগত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১ লাখ ৩২ হাজার ১৭০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। অর্থবছর শেষে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ৯৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। বাজেটে খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে ব্যয় করা অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ৫২ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ৯৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে ব্যয় হয় ১ লাখ ৭৪ হাজার  কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাজেট বাস্তবায়নের হার ৯০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো বাজেটের আকার ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা হয়। বছর শেষে  মোট বাজেটের মধ্যে ব্যয় হয় ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। বাজেট বাস্তবায়নের পরিমাণ ৮৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাজেট ঘোষণা করা হয় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়ন করা হয় ২ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে বাজেট বাস্তবায়নের হার ৮১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। পরে তা কমিয়ে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা। বাজেট বাস্তবায়নের হার ৭৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। বছর শেষে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ৭৬ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাজেটের আকার ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ২৮ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা কাটছাঁট করা হয়। বছর শেষে বাজেট বাস্তবায়নের হার দাঁড়ায় ৭০ শতাংশের কিছু বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটের আকার ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। সংশোধিত বাজেটে এর আকার দাঁড়ায় ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। প্রকৃত বাস্তবায়িত হয় ৩ লাখ ৯১ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ৮৯ শতাংশের কম। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট পেশ করা হয়েছিল গত ১৩ জুন ২০১৯ তারিখে। ২১ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত বাজেট ঠিক করা হয় ৫ লাখ ১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। করোনার প্রভাবে বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে ৭০ শতাংশের কম। চলতি ২০২০-২১ বছরের মূল বাজেট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার। গত ৯ মাসে উন্নয়ন বাজেট সংশোধনের পরও ৪২ শতাংশ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। করোনার ঢেউয়ে সংশোধিত ব্যয়কাঠামোর বাস্তবায়নও হচ্ছে না। উপরন্তু, গত কয়েক বছর ধরে প্রত্যাশিত হারে আয়ও বাড়ছে না। রাজস্ব খাতে নানান বিশৃঙ্খলার কারণে আয় কমেছে। যদিও পরোক্ষ করের চাপে পড়েছে সাধারণ ভোক্তারা।

অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশের বাজেটের আকার প্রথমবারের মতো লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। গত ১০ বছরে নানা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ফলে বাজেটের আকার বেড়ে যায়। তবে শতভাগ বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক দক্ষতা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।