দুর্বিষহ এক অস্থিরতায় পৃথিবী। করোনার প্রবল থাবায় থমকে গেছে স্বাভাবিক জীবন। দিনদিন বেড়ে চলছে করোনার প্রসারতা। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা রয়েছি এক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে। ঘনসন্নিবিষ্ট পরিবেশ এড়িয়ে যতটা সম্ভব ঘরে থাকাই এখন করোনা থেকে বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। তবে দীর্ঘদিনের এই বন্দিদশায় অনভ্যস্ততা তৈরি করছে নানা ধরনের জটিল সমস্যা। বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি যেই বিষয়টি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে তা হলো মানসিক সমস্যা। তাই মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা হতে পারে আমাদের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ।
করোনার এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে আমাদের বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে শিশুদের প্রতি। দীর্ঘদিনের কোণঠাসা অবস্থা অপরিপক্ব শিশু মনে তৈরি করতে পারে বিষণ্নতা ও ব্যাকুলতা। পেশাজীবী বাবা-মায়েরা এই সুযোগটিকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে পারেন। সন্তানের সঙ্গে বেশি সময় কাটানোর মাধ্যমে সন্তানের মানসিক অবস্থান বুঝতে পারা যায় এবং একই সঙ্গে সম্পর্ক আরো বেশি দৃঢ় করা সম্ভব। সন্তানের আগ্রহমাফিক তাদের সঙ্গে খেলাধুলা করা, গল্প করা, সময় কাটানো, বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
তরুণদের জন্য এই সময়টা খুবই দুরূহ। ব্যস্ত জীবনে অকস্মাত্ এই বদ্ধতায় অনেকেই হয়ে পড়ে হতাশ। এক্ষেত্রে নিজের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে এই সময়টাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যদি আপনার আইটি বিষয়ে কিছুটা জ্ঞান ও আগ্রহ থাকে, তবে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন কোর্স করতে পারেন, যা পরবর্তী জীবনে কাজে দিবে। যেমনঃ ওয়েব ডিজাইনিং, গ্রাফিক্স ডিজাইনিং ইত্যাদি। এছাড়া যুক্ত হতে পারেন অনলাইনভিত্তিক পাঠদান কার্যক্রমে। এছাড়াও আপনি যদি বই পড়তে ভালোবাসেন, তবে নতুন নতুন বইয়ের পিডিএফ ফাইল এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পুরাতন বইগুলো আবার পড়তে পারেন, যা এনে দিবে মানসিক প্রশান্তি। অত্যধিক সোশাল মিডিয়া ব্যবহার থেকে বিরত থাকা কিংবা অযথাই পরিবারের মানুষের সঙ্গে তর্কে না জড়ানো আপনাকে হতাশা এবং বিষণ্নতা থেকে দূরে রাখবে। মা-বাবা এবং নিজের আপনজনদের অধিক সময় কাছে পাবার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে ভাবলেই করোনাকালীন এই সময়টি হবে আপনার জন্য সহজ, আনন্দঘন একটি সময়।
দাম্পত্য জীবনে এই কঠিন সময়টি পার করার ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে হবে। পরস্পরের মতামতকে সম্মান জানানোর প্রবণতা তৈরি এক্ষেত্রে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখবে। একে অপরের সঙ্গে ভালো সময় কাটানো, কিংবা নিজেদের প্রিয় কাজগুলো করা যেতে পারে। ঘরের কাজ উভয়ে ভাগ করে করা যায়। এতে পারস্পরিক সমঝোতা যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে সম্মান। এছাড়াও যেহেতু এখন হাতে অনেকটা অবসর সময়, দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। এতে ভুল বোঝাবুঝি কেটে যাবে এবং দাম্পত্যজীবন সুখের হবে। ফলে মানসিক প্রশান্তির পথ সুগম হবে।
করোনাকালীন এই কঠিন পরিস্থিতিতে আমাদের বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের প্রতি। সচরাচর তাদের জীবনটা একাকিত্বেই কাটে। পাশাপাশি শারীরিক নানা অসুস্থতা তাদের মধ্যে হীনমন্যতার জন্ম দেয়। তাই তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তাদের সঙ্গে বেশি সময় কাটানো উচিত। যে কোনো বিষয়ে তাদের মতামত নেওয়া উচিত। এতে পরিবারে তাদের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে। ঘরোয়া আড্ডায় তাদের শামিল করা, তাদের পছন্দের খাবার তৈরি করে খাওয়ানো বা তাদের সঙ্গে বসে পুরোনো স্মৃতি আওড়ানোর মাধ্যমে তাদের উত্ফুল্ল রাখা যেতে পারে। কোনো অবস্থাতেই তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। এতে তারা পরিবারে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভাববে এবং হীনমন্যতা কেটে যাবে।
এছাড়াও ব্যক্তিজীবনে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যাপক সচেতন হওয়া উচিত। পরিবারের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানো এবং পরিবারের অন্য সব সদস্যদের খেয়াল রাখার পাশাপাশি নিজের মানসিক সুস্থতা ও উত্ফুল্লতা বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। নিজের পছন্দ অপছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নিজের পছন্দের খাবার তৈরি করা যেতে পারে। এছাড়া বারান্দায় স্বল্প পরিসরে গাছ লাগানো, পরিচর্যা করা, নিজের ঘরের আসবাবপত্রের অবস্থান পরিবর্তন করার মাধ্যমেও পাওয়া যেতে পারে মানসিক প্রশান্তি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
