হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী এবং একজন মহাত্মা

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৫৩

মহাত্মা, অর্থাত্ যিনি মহত্ আত্মার অধিকারী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন উপাধি দিয়াছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে। সারা বিশ্ব এখন ‘মহাত্মা গান্ধী’ আর ‘অহিংসা’কে একে-অপরের পরিপূরক বলিয়া মনে করে। মহাত্মার জন্মভূমি ভারতবর্ষ একটি বৃহত্ দেশ। ইহার পূর্বপ্রান্ত হইতে পশ্চিমপ্রান্ত এবং উত্তরে হিমালয় হইতে দক্ষিণে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত যেই বিপুল বৈচিত্র্য দৃশ্যমান—তাহাই ভারতের সবচাইতে বড় সৌন্দর্য। আর এই সৌন্দর্যেরই দর্পণ হইয়া উঠিয়াছেন গুজরাটে জন্ম নেওয়া মহামানব মহাত্মা গান্ধী। হয়ত মনে হইতে পারে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস-নীতি এমন কী কঠিন কাজ। গান্ধী জীবনীতে জানা যায়, একবার সাবারকর নামের এক ডাক্তার গান্ধীর সহিত তাহার হিংসা-অহিংসা নীতি লইয়া তর্ক করিতেছিলেন। সাবারকর বলিলেন, গান্ধীজী মনে করুন একটা বিরাট বিষধর সাপ আপনার দিকে ধাবিত হইল আর আপনার হাতে আছে একগাছা লাঠি। আপনি কী করিবেন? মারিবেন, না মরিবেন?’ গান্ধী উত্তর দিলেন, ‘লাঠিখানা আমি ছুড়িয়া ফেলিয়া দিব, পাছে উহাকে মারিবার লোভ জাগে।’

কিন্তু গান্ধী কী করিয়া এমন অহিংস-নীতিকেই সর্বজ্ঞান করিলেন? আমরা দেখিতে পাই যে, মহাত্মার মাতা পুতলিবাই গান্ধী ছিলেন প্রণামী বৈষ্ণব গোষ্ঠীর। মায়ের সাহচর্যে শৈশবকাল হইতেই তিনি জীবের প্রতি অহিংসা, নিরামিষভোজন, আত্মশুদ্ধির জন্য উপবাস এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সহিষ্ণুতার বিষয়াদি শিখিতে শুরু করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি ঝাঁপাইয়া পড়েন অস্পৃশ্যতা, মদ্যপান, অবজ্ঞা এবং দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে আসার পর গান্ধী ভারতব্যাপী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ, জাতির অর্থনৈতিক সচ্ছলতাসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করেন। ইহার মূলে ছিল জাতীয়তাবাদ। তিনি স্বরাজ বা ভারতকে বিদেশি শাসন হইতে মুক্ত করিবার লক্ষ্যে দেশপ্রেমের নূতন নজির গড়িয়া তোলেন। ১৯৩০ সালে গান্ধী ভারতীয়দের উপর ব্রিটিশদের আরোপিত লবণ করের প্রতিবাদে চারশত কিলোমিটার দীর্ঘ লবণ-পদযাত্রায় নেতৃত্ব দেন। ১৯৪২ সালে ইহা ইংরেজ শাসকদের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। পরিতাপের বিষয় হইল—ভারত স্বাধীন হইবার পর ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহান এই নেতার মৃত্যু হয় অহিংস ও অসাম্প্রদায়িক নীতির কারণেই।

ঘাতকের গুলিতে লুটাইয়া পড়িবার পর মহাত্মা গান্ধী কেবল ছোট্ট দুইটি শব্দ উচ্চারণ করিয়াছিলেন—‘হে রাম’! তিনি যেন বিশ্বাস করিতে পারেন নাই স্বাধীন ভারতে কেহ তাঁহাকে মারিতে পারেন! নিরাভরণ জীবনাচরণ ও অহিংস-নীতির যেই দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করিয়া গিয়াছেন—তাহা কেবল ভারতবর্ষে নহে, সমগ্র পৃথিবীকেই নূতন আলোয় উদ্ভাসিত করিয়াছে। রবীন্দ্রনাথের—‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব’ কবিতার পঙিক্ত যেন অস্থির করিয়া তুলিতেছে এই বিশ্বকে। এই অস্থির সময়ে মহাত্মা গান্ধী যেন লাইটহাউস হইয়া পথ দেখাইতেছেন আমাদের।