জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেটর (জিআই) ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের তালিকায় এবার নাম উঠলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ক্ষীরশেপাতি আম। ক্ষীরশেপাতি আমের স্থানীয় ও জনপ্রিয় আরেকটি নাম হলো ‘হিমসাগর’। এটি বাংলাদেশে জিআই তালিকায় উঠা তৃতীয় পণ্য। এর আগে বিগত মাত্র ২-৩ বছরে গুরুত্বপূর্ণ জিআই পণ্যের তালিকায় নাম উঠে এসেছে আরো দুটি ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্য যথাক্রমে বাংলাদেশের জামদানি শাড়ি এবং ইলিশ মাছ। এ পণ্যগুলো আমাদের বাংলাদেশের নিজস্ব এবং একেবারে অনন্য ও ঐতিহ্যবাহী। শতাব্দী ধরে এসব পণ্য ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের সীমানায় আবদ্ধ হয়ে ছিল। প্রয়োজন ছিল শুধু স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির।
এতদিন কেন হয়নি, এখন কেন হুর হুর করে একের পর এক পণ্য জিআই তালিকায় স্থান পাচ্ছে- এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। এর উত্তর একেবারেই সোজা-সাপটা ও সাধারণ। কারণ এর আগে এমনভাবে কেউ চিন্তা করেনি। উদ্যোগ নেয়নি কোনো সরকার। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প বিপ্লবের দিকে ছুটতে থাকে দেশ। সেজন্যই অনুভব করে কোন কোন দিকে সেগুলো সম্প্রসারিত করা যায়। বিভিন্ন মেয়াদী মিশন, ভিশন, পরিকল্পনা, রূপকল্প ইত্যাদি গৃহীত হতে থাকে। তারই সূত্র ধরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এ সম্পর্কিত বিষয়ে প্রথমে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন-২০১৩ পাস করা হয় এবং পরে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) বিধিমালা-২০১৫ প্রণয়ন করা হয়। এতেই বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যগত পণ্যসমূহের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দ্বার উন্মোচন হয়ে যায়।
এবারে বাংলাদেশের তৃতীয় পণ্য হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরশেপাতি আম জিআই পণ্যের তালিকায় উঠে আসায় চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সারাদেশে আনন্দের বন্যা বয়ে চলেছে। আনন্দ বইছে আম উত্পাদক, ব্যবসায়ীসহ সকলের মাঝে। আমরা জানি, কোনো দেশের যেকোনো একটি পণ্যের বিশেষত্ব তার উত্পাদন, মালিকানা, ভৌগোলিক পরিসীমা, সহজলভ্যতা ইত্যাদির উপর নির্ভর করে। পরিসংখ্যানে পাওয়া গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় মোট যে-আম উত্পন্ন হয় তার মধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ভাগ আম হলো ক্ষীরশেপাতি জাতের। প্রতিবছর সেখানে এ জাতের আম উত্পাদন হয় প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন। তার একটি বিরাট অংশ দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা হয়ে থাকে। কারণ এ জাতের আমের সুন্দর ও আকর্ষণীয় আকার, রঙ ও স্বাদের জন্য তা দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
জিআই তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণে এখন থেকে ক্ষীরশেপাতি আম একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য পাবে। নিজেদের পণ্য হিসেবে বহির্বিশ্বে এর সুনাম ও গুরুত্ব বাড়বে, উজ্জীবিত হবে সংশ্লিষ্ট এলাকার আমচাষি। আর তাতে বাড়বে আম নির্ভর কৃষি অর্থনীতি। আওয়ামী লীগ ধারাবাহিকভাবে তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করার মাত্র এক মাসের মধ্যেই শিল্প মন্ত্রণালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব প্যাটেন্টস এন্ড ডিজাইন ট্রেডমার্ক (ডিপিডিটি)-এর নিকট বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)-এর আম গবেষণা কেন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে জিআই সনদের জন্য প্রস্তাব দেওয়ার প্রেক্ষিতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া সম্পন্ন শেষে সম্প্রতি সরকারের তরফ থেকে এ সনদ প্রদান করা হয়।
জামদানি শাড়ি এবং ইলিশ মাছের জিআই সনদ প্রাপ্তির পর ক্ষীরশেপাতি আমের এ সনদ প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় এমন আরো অনেক ঐতিহ্যবাহী পণ্যেকে উক্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি এখন সময়ের দাবি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। জানা গেছে, ক্ষীরশেপাতি আমকে জিআই তালিকায় অন্তর্ভুক্তির আবেদনের সময় এসব এলাকার বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ল্যাংড়া, আশ্বিনা ইত্যাদি জাতের আমের ব্যাপারেও আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রাথমিকভাবে ক্ষীরশেপাতি আমকে জিআই তালিকাভুক্ত করেছেন, আর বাকিগুলোকে পর্যায়ক্রমে বিবেচনা করা হবে মর্মে জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন।
তারই ধারাবাহিকতায় সরকারও দেশের ভৌগোলিক ঐতিহ্যের সীমানায় থাকা ফুল, ফল, পাখি, ফসল ইত্যাদিসহ অন্যান্য সম্ভব সকল পণ্য উক্ত তালিকায় আনার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে তাগিদ দিয়েছেন। এভাবে চললে কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, রপ্তানি ইত্যাদি বিষয়ে সমন্বিতভাবেই এগিয়ে যাবে দেশ, দেশের অর্থনীতি ও ঐতিহ্য।
n লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
