অবিনাশী হুমায়ুন আজাদ

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২১, ২১:২১

একটি মধ্যযুগীয় অন্ধকারকে সমাজের নির্জীব ফসিল থেকে রক্ষা করার জন্য কলম ধরেছিলেন আমাদের কালের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক অবিনাশী হুমায়ুন আজাদ। যিনি ছিলেন এই সময় এবং সংকটের অন্তর্ভেদী বিশ্লেষক, স্বাধীনচেতা মানুষের প্রতিভূ, আমাদের একমাত্র মেরুদণ্ড। আমাদের আলোর আশিস। আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করার জন্য যিনি বাঙালির চেতনার ঘরে কিছু রোদ জ্বেলে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন আগামী প্রজন্ম ফুটে উঠবে সেই রোদের তাপে। তারা শিখবে বাঙালির শেকড়ের কথা। তারা নষ্ট হবে না, পথভ্রষ্ট হবে না, আক্রান্ত হবে না মধ্যপ্রাচ্যের ধর্ম দ্বারা, আক্রান্ত হবে না আর্যদের ধর্ম দ্বারা। তারা হবে সেই অনার্য, যাদের প্রাণে থাকবে বাঙালির প্রতি নিখাদ মমত্ব। কিন্তু তাঁর পঙিক্ত, তাঁর ভাষা, আপামর জীবন পর্যন্ত ভেসে গেল তিমিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে করে।

যদিও তিনি জয়ী হতে পেরেছিলেন, কিন্তু তাঁর সেই পেরে ওঠাকে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মৌলবাদীরা মেনে নেয়নি। অথচ সেই তুমুলভাবে বেঁচে থাকার মধ্যে প্রতি মুহূর্তে হুমায়ুন আজাদ নিজস্ব চেতনাকে ধারণ করেছিলেন। মর্মে মর্মে ধারণ করেছিলেন বাংলাকে। কিন্তু যারা বাঙালি হয়েও বাংলার চিরায়ত ধর্ম, বিশ্বাস, বোধকে বিশ্বাস করে না তারা সর্বদাই সক্রিয় ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। হুমায়ুন আজাদ সক্রিয় ছিলেন তাদের চিহ্নিত করতে এবং তাদের মুখোশ খুলে দিতে। সেটা ছিল বুদ্ধি ও প্রজ্ঞায়। কিন্তু মৌলবাদীরা কোনোদিনও বুদ্ধি ও প্রজ্ঞায় পেরে ওঠেনি। তাই শক্তি দিয়েই বারবার রুদ্ধ করতে চেয়েছে তাঁর চিন্তা, বুদ্ধি ও প্রজ্ঞাকে।

যারা একাত্তরে বাংলাদেশ চায়নি, চেয়েছে পাকিস্তান, বায়ান্নে বাংলা চায়নি চেয়েছে উর্দু, তারা এখনো চায় না হুমায়ুন আজাদদের মতো তীক্ষ আর ক্ষুরধার লেখক এই দেশে আর একজনও থাকুক। তাই তারা হুমায়ুন আজাদকে চাপাতির কোপে রক্তাক্ত করেছিল বটে তবে তাঁর চিন্তাকে শেষ করতে পারেনি। শুধু মানসিক যন্ত্রণা, পরিবারের ওপর অনবরত হুমকিতে তাঁর যাপিত জীবন রুদ্ধ করে রেখেছিল তারা। যদিও তাঁর অগ্নিশাণিত লেখাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। আমৃত্যু তিনি এক ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ, বিদ্রোহী সত্তা এবং অসাধারণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেঁচেছিলেন।

যাঁর দ্রোহী চেতনা কখনো আপস করেনি নষ্ট সময়ের সাথে। যাঁর অবিরাম রক্তক্ষরণ পাশব বাস্তবের সঙ্গে যুদ্ধে। যে যুদ্ধে তিনি ছিলেন একান্তই একা, নিসঃঙ্গ শেরপা। যেখানে অজস্র অগুনতি বামুনের বাস সেখানে একজন আত্মপ্রত্যয়ী প্রবল প্রমিথিউস হুমায়ুন আজাদ লড়েছিলেন একাকীই। যেখানে প্রতাপের রাজত্ব করছে নতজানু নষ্ট রাজনীতিক, আত্মরতির সম্মোহনে রত চাটুকার বুদ্ধিজীবী এবং দৃশ্যমান ঈশ্বর অর্থের পিছু ধাওয়া ক্লীব পুরুষেরা। এমন অসহ্য সময়ে হুমায়ুন আজাদ একটি গ্রন্থের নামও দিয়েছিলেন ‘আমি বেঁচেছিলাম অন্যদের সময়ে’। মনে হয় সত্যি সত্যি তিনি জন্ম নিয়েছিলেন কাঙ্ক্ষিত সময়ের অনেক আগেই। অথচ এই অন্ধকার সময় তাঁকেই কেড়ে নিল না শুধু, কেড়ে নিয়েছে এক সমৃদ্ধ ভাবুক বাঙালিকে। তিনি না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার পর তখনই মনে হয়েছিল এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ দেশে প্রতারিত হলো সময়, দ্রোহ, চেতনা, সমাজ, মানুষের চিন্তা ও বিবেক। অথচ এই ঘুণে ধরা, অন্ধ, সাম্প্রদায়িক, ঘিনঘিনে অবক্ষয়গ্রস্ত অশ্লীল সমাজ দেখে এখন আর কেউ চিত্কার করে অশ্লীল বলে না। একা হুমায়ুন আজাদই একমাত্র ঠেকাতে পারতেন আমাদের এইসব সমূহ পতন।

আজাদও বেশ বুঝতে পেরেছিলেন রাষ্ট্রীয় মনোভাব প্রকাশ্যে তাঁর পক্ষে হলেও ভেতরে তারা তাঁকে চায়নি কখনোই। কারণ সরকারের বন্ধ্যাত্ব, মিথ্যাবচন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে আজাদ ক্রমশ জনগণের কাছে উন্মোচিত করেছিলেন নির্ভয়ে, নিঃশঙ্কচিত্তে। আপাতদৃষ্টে তীব্র শ্লেষ, তীক্ষ বিদ্রুপ বিস্ময়কর শব্দচয়নের মাধ্যমে প্রচণ্ড কষাঘাত, যা মনে হয় এই প্রকাণ্ড সমাজের পিঠেই ক্রমাগত চাবকে গেছেন। আসলে প্রতিটি চাবুক যেন তিনি মেরেছেন নিজের পিঠেই। এভাবেই আজাদের মতো মহত্ সাহিত্যিকরা নিজের সময়ের হলাহল পান করে নীলকণ্ঠ হয়ে যান! সমকাল তাঁকে হজম করতে না পারলেও উত্তরপ্রজন্ম তাঁকে যে লাল কুর্নিশ জানাবে মননের মুকুটে তাঁর কীর্তি যে তাদের শিরস্ত্রাণ হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

হুমায়ুন আজাদ কেবল একজন ব্যক্তি মানুষই ছিলেন না; তিনি ছিলেন মৌলবাদের থাবায় ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশকে সুস্থ করে তোলার একটি হাসপাতালও। ব্যক্তিগতভাবে আমি এমনটাই মনে করি। আর তাই তাঁকে পুরোটা দেখার জন্যই আমার ভেতরে দুর্মর কৌতূহল জেগে থাকত। সেই কৌতূহলের টানেই চট্টগ্রাম থেকে ছুটে আসতাম। সুযোগও হয়েছে তাঁর মুখোমুখি বসে অমূল্য কথাগুলো শোনা এবং লিপিবদ্ধ করার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তাঁর সামনে বসে সাক্ষাত্কার নিয়েছি দফায় দফায়। হিমালয়সম সেই মানুষটির নতুন চিন্তা আর দর্শনের কথা শুনে কখনো মুগ্ধ হয়েছি, কখনো চমকে গিয়ে আমার পৃথিবীর পুরোটাই বদলে গেছে। তাঁর অসামান্য মানবিক স্নেহের ছোঁয়ায় একসময় আজাদ পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠার সুযোগ লাভ করেছিলাম। আজও সে সম্পর্কের মধ্যেই তাঁর অস্তিত্বকে অনুভব করি অকুণ্ঠচিত্তে। তাঁর চিন্তা দর্শনের সুকঠিন দেয়ালের ওপাশে তিনি এতটাই কোমল হদয়ের যে অনেক সময় মেলাতেই পারিনি প্রবল মানবিক সেই মানুষটিকে। ২০০৩ সালে তাঁকে নিয়ে আমার সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা ‘বলাকা’র সেপ্টেম্বর সংখ্যাটি তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাত্কার নিয়ে প্রচ্ছদকাহিনি করেছিলাম। পত্রিকাটি প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁকে পাঠিয়ে ফোনে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে অপর প্রান্ত থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘এখানে আমাকে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। কেবল অবহেলাই করেছে। বলাকায় আমাকে নিয়ে প্রচ্ছদ কাহিনি করে তুমি যে সম্মান দিয়েছ, তা ঘটা করে আমাকে নিউ ইয়র্কে দেওয়া সংবর্ধনার চাইতেও আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ’। আরো কত কথা...! সেসব বুকের ভেতর বন্দিবিস্তর। তখন মনে হচ্ছিল স্যার আবেগে আনন্দে কাঁপছিলেন। এছাড়াও পাঁচ-পাঁচটির মতো সাক্ষাত্কারের মধ্য দিয়ে তাঁকে পুরোটা পড়ার চেষ্টা করেছি। তবে সেটা ছিল আমার দুঃসাধ্য চেষ্টা। কারণ একজন হুমায়ুন আজাদই ছিলেন আমার চোখে প্রথাভাঙা কালোত্তীর্ণ এক বিশ্বজনীন বাঙালি। অভিভাবকতুল্য আজাদ স্যারকে হারিয়ে ভেতরটা সেই যে স্তব্ধ হয়ে গেছে, তা আর মুখর হয়নি! 

যদি সাহিত্যের আয়নায় তাঁকে দেখা হয়, সেখানেও অনন্য এক হুমায়ুন আজাদকে আবিষ্কার করা যায়। তিনি বর্তমান বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় ‘অপন্যাসে’র ভিড়ে জনপ্রিয় উপন্যাস লেখায় সমর্থ হয়েছিলেন। জনপ্রিয় লেখামাত্রই যে শিল্পসম্মত নয়, সে ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে তিনি জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক রূপেই শিল্পনির্ভর সার্থক উপন্যাস রচনা করে গেছেন। যদিও তিনি খুব সাধারণ পাঠকের ঔপন্যাসিক নন; তাঁর রচনা ছিল সচেতন পাঠকের জন্য। সচেতন পাঠকের কাছেই তিনি জনপ্রিয়। তাঁর প্রতিটি চরিত্রই বিদ্রোহী, আপসহীন, সংগ্রামী। তাঁর নিজস্ব এক অসামান্য ভাষাশৈলী ছিল। যা সহজ সরল এবং কাব্যিক। 

দেখা গেছে নারীরা সারাজীবন পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মার খেয়েছে, এমনকি সাহিত্যেও। সাহিত্যেও তারা পুরুষ ও পুরুষতন্ত্রের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছে। কিন্তু তাঁর উপন্যাসে এটা ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি নারীকে দিয়েই পুরুষের একনায়কতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনাকে প্রতিহত করেছেন, আঘাত করেছেন পুরুষতন্ত্রের মগজে। তেমনি তাঁর উপন্যাসে কামদৃশ্য, যৌনতা এসেছে সময়, বাস্তবতা এবং চরিত্রের প্রয়োজনে, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নয়। উপন্যাসের পরিস্থিতি যখন প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে যায় তখন যৌনতা না আনাই অশ্লীল; কামকে মধ্যযুগীয় চিন্তাশীল লেখকদের মতো এড়িয়ে চলাই অনাধুনিক ঠেকে। একজন পুরুষ হয়েও বাংলা সাহিত্যে প্রকৃত নারীবাদী উপন্যাসের প্রবক্তাই বলা যায় হুমায়ুন আজাদকে।  

তাঁর বিখ্যাত ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ উপন্যাসের আগাগোড়াই ছিল লোমহর্ষক ঘটনার নায়ক বাংলা ভাইকে নিয়ে। মুখোশ উন্মোচনের এক অসাধারণ বয়ান। স্বদেশ এবং স্বজাতি সম্পর্কে কতটা জাগ্রত এবং দূরদর্শী হলে এ ধরনের একটি উপন্যাস লেখা সম্ভব— ভাবলে আজও বিস্মিত হই। যেখানে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিপুল উত্থান বয়ান করে নিজেকে বিপদাপন্ন করেছেন তিনি। একা হলেও তিনি অত্যন্ত দুঃসাহসী এক প্রমিথিউস। তাঁর পাশে কেউ আছে কি না তা না ভেবেই তিনি পথ চলেছিলেন অসীম বরাভয়ে। কিন্তু বাংলা ভাই বাহিনী তাঁকে রেহাই দেয়নি। তারা তাঁকে সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ করেছে। যে আক্রমণ ছিল তাঁকে হত্যা করার জন্যই। কিন্তু দুর্মর জীবনীশক্তি নাকি স্বদেশের রক্তাক্ত শরীরের নিঃশেষিত রূপ শেষাবধি দেখে যাওয়ার মানসে তিনি নশ্বর দেহ ত্যাগ করেননি, ক্ষত-বিক্ষত দেহ নিয়ে তিনি অনেকদিন টিকে ছিলেন, যেমন সারা দেহে প্রতিদিনের সাম্প্রদায়িক মৌলবাদের আঘাতের নতুন নতুন চিহ্ন বুকে ধারণ করে বেঁচে আছে আমাদের দুঃখিনী মাতৃভূমি প্রিয় বাংলাদেশ।