১৪৪২ হিজরির আজ সপ্তদশ রমজানুল মোবারক। কোরাইশ বংশের গর্বের ধন তথা সমস্ত বিশ্ব মাখলুকের শেষ নবি এবং রসুল বিশ্ব নবি সাইয়িদুনা হজরত মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (স.)-এর নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ। মদিনা মুনাওয়ারা থেকে প্রায় ৮০ মাইল দূরে অবস্থিত একটি কূপের নাম ‘বদর’। সেখানে এই কূপের নামে একটি গ্রামও রয়েছে। ইতিহাসখ্যাত ‘বদর যুদ্ধ’ এই স্থানে সংঘটিত হয়েছিল দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজানুল করিমে।
মহানবি (স.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলে মক্কার কোরাইশরা মুসলমানদের বাড়িঘর লুট করে। এছাড়া এই কোরাইশদের সব ধরনের শক্তি-সামর্থ্যের প্রধান উত্স ছিল সিরিয়ায় তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য। তাই রাজনৈতিক নীতি ও কৌশল হিসেবে তাদের শক্তিমত্তা বিনষ্ট করার উদ্দেশে এ ব্যবসার ধারা বন্ধ করে দেওয়া প্রয়োজন ছিল। এ সময় কোরাইশদের একটি সুবিশাল বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে ফিরছিল। এ সম্পর্কে জানতে পেরে দ্বিতীয় হিজরির ১২ রমজানুল করিমে নবিয়ে আকরাম (স.) ৩১৪ মুহাজির ও আনসার সাহাবি সঙ্গে নিয়ে তাদের মোকাবিলা করতে নিজেই ময়দানে বের হয়ে পড়লেন।
রাওহা নামক স্থানে পৌঁছার পর তারা সেখানে তাবু ফেললেন। রাওহা মদিনা শরিফের দক্ষিণে ৪০ মাইল দূরবর্তী একটি জায়গার নাম। এদিকে কোরাইশদের বাণিজ্যবহরের নেতা এ খবর জানতে পেরে সে ঐ রাস্তা বাদ দিয়ে সমুদ্রের উপকূল ধরে কাফেলা নিয়ে এগিয়ে চলল। সেই সঙ্গে ঘোড়সওয়ার লোককে মক্কার দিকে দৌড়ে পাঠাল এ কথা জানাতে, কোরাইশগণ নিজের পূর্ণ ক্ষমতা ও শক্তি নিয়ে যেন এই জায়গায় এসে পৌঁছে যায় এবং নিজেদের বাণিজ্য কাফেলাকে বিপদ হতে রক্ষা করে। কোরাইশরা পূর্ব থেকে মুসলমানদের মূলোচ্ছেদ করার ফন্দিফিকির খুঁজে ফিরছিল। খবরটি মক্কায় পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে ৯৫০ জন যুবকের এক বড় সেনাদল, যাদের মধ্যে ১০০ ঘোড়া ও ৭০০ উট ছিল, তারা নবিয়ে করিম (স.)-এর মোকাবিলা করার জন্য রওনা হয়ে গেল। এই সেনাদলে কোরাইশদের বড় বড় নেতা এবং বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ সবাই অংশ নিয়েছিল। নবিয়ে করিম (স.) যখন এ বিষয় জানতে পারলেন, তখন তিনি সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। হজরত আবু বকর (রা.) এবং অন্য সাহাবিগণ নিজেদের জীবন ও সম্পদ নবিজির নিকট সমর্পণ করে দিলেন। হজরত উমায়ের ইবনে ওয়াক্কাস (রা.) সে সময় কম বয়সি ছিলেন। তাই নবিয়ে করিম (স.) তাকে জিহাদে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখেন। তিনি কাঁদতে শুরু করেন। এ অবস্থায় নবি করিম (স.) তাকে জিহাদের অনুমতি প্রদান করেন। (কানজুল উম্মাল ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৭০)
আনসারদের মধ্য থেকে খাযরাজ গোত্রের দলপতি হযরত সাদ ইবনে উবাদা (রা.) উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আল্লাহর কসম, আপনি নির্দেশ দিলে আমরা সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ব (মুসলিম শরিফ)। ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধে মুসলানদের বিজয় হয়েছিল এবং কাফেরদের পরাজয় হয়েছিল এবং অসংখ্য কাফের বদর যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দি হন।
এই বন্দিদের মধ্যে নবিয়ে করিম (স.)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা.) ছিলেন। তিনি পরবর্তী সময়ে ইসলাম কবুল করেন। হযরত আব্বাস (রা.) রাতের বেলা বন্দি থাকায় কষ্টে কাতর ছিলেন। তার কাতরধ্বনি নবি করিম (স.)-এর পবিত্র কানে গিয়ে পৌঁছালে সঙ্গে সঙ্গে তার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি আর ঘুমাতে পারলেন না। সঙ্গী-সাথিরা ভোরবেলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রসুল (স.), আপনার ঘুম আসেনি কেন?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি কীভাবে ঘুমাব, যেখানে আমার সম্মানিত চাচাজানের কাতরধ্বনি আমার কানে আসছে? (কানজুল উম্মাহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৭২)
এ বছর, অর্থাত্ দ্বিতীয় হিজরিতে বদর প্রান্ত থেকে ফিরে আসার পর প্রথম বার ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়া হয়। রমজানের রোজা, ছাদকায়ে ফিতর এবং যাকাত এ বছরই ফরজ করা হয়। (সিরাতে মুগলতাই)।
লেখক :অতিথি অনুবাদক, মক্কা আল মুকাররামাহ ও সাবেক খতিব, জাতীয় সংসদ জামে মসজিদ
