যুক্তরাষ্ট্রে ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি চীনা হুমকি মোকাবিলায় সবাইকে সতর্ক থাকারও আহ্বান জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার অবকাঠামো খাতে নেওয়া উদ্যোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং ধনীদের আরো বেশি কর দিতে উদ্বুদ্ধ করেন। সরকারের প্রথম ১০০ দিনে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত বুধবার কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেন। তার পেছনে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস এবং প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যানসি পেলোসি। এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষণের সময় দুই নারী পেছনে অবস্থান করলেন। প্রেসিডেন্ট বাইডেন ভাষণে তার সরকারের অর্জনের কথা তুলে ধরেন। খবর বিবিসি ও রয়টার্সের
প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, তিনি চীনা প্রেসেডন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য অনেক সময় ব্যয় করেছেন। প্রেসিডেন্ট শি বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ও আত্মগরিমাপূর্ণ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চেষ্টা করছেন। তিনি এবং তার মতো আরো স্বৈরশাসকেরা মনে করেন, একবিংশ শতাব্দীতে স্বৈরশাসনের সঙ্গে গণতন্ত্র প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না।
বাইডেনের যা কিছু অর্জন
প্রেসিডেন্ট পদে জো বাইডেনের প্রথম ১০০ দিনে তার অর্জনের ঝুলি অর্ধেক ভর্তি হয়েছে এবং অর্ধেক খালি রয়েছে। এক অর্থে বলা যায় তিনি ভালোই করছেন। স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং বন্দুক নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোতে তার নীতি কতটা সাফল্য আনতে পারবে, তা এখনো অনিশ্চিত। ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিন পর প্রেসিডেন্ট কোথায় দাঁড়িয়ে, চাপের মুখে তার নতুন প্রশাসন কী অর্জন করতে পারল, তার একটা মূল্যায়ন করার রীতি অনেক দিনের পুরোনো। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রে তার অর্জনের একটা খতিয়ান।
করোনা ভাইরাস :বাইডেন যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন কোভিড-১৯ থেকে আমেরিকানদের মৃত্যুর হার প্রায় প্রতিদিনই ছিল ৩ হাজার করে। এখন মৃত্যুর হার সাত দিনের গড় হিসাবে দিনে ৭০৭ এবং এই সংখ্যা কমছে। এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ তার প্রশাসনের নেওয়া ভ্যাকসিন কর্মসূচি। বাইডেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতা হাতে নেওয়ার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে তিনি ১০ কোটি ডোজ টিকা দেবেন। আমেরিকা সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এখন ২০ কোটি ডোজের বেশি টিকা প্রদান করা হয়েছে। আমেরিকার প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৫২ শতাংশ ইতিমধ্যে অন্তত এক ডোজ ভ্যাক্সিন পেয়েছেন। বাইডেন প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অনাগ্রহী আমেরিকানদের ভ্যাকসিন নিতে উদ্বুদ্ধ করা।
অর্থনীতি :কোভিডের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ছিল বাইডেনের প্রথম অগ্রাধিকার। মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার তার প্রেসিডেন্সির দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ। গোড়া থেকেই তার প্রশাসন এবং কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা প্রবৃদ্ধি চাঙ্গা করার লক্ষ্যে বিশাল অঙ্কের সরকারি তহবিল অনুমোদন করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যে ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের সাহায্য প্যাকেজ পাশ করা হয়, তার আওতাভুক্ত ছিল বহু আমেরিকানের জন্য সরাসরি অর্থসাহায্য, বাড়তি বেকার ভাতা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাজ্য সরকারগুলোর জন্য অর্থ তহবিল। এছাড়া শিশুদের জন্য যে সহায়তা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে, অনুমান করা হচ্ছে তা আমেরিকায় তরুণদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনবে। অর্থনীতিবিদেরা আভাস দিয়েছেন যে, ২০২১ সালে আমেরিকার প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ শতাংশ। ১৯৮০-এর দশকের পর প্রবৃদ্ধির এত নিম্ন হার দেখা যায়নি। তবে এই মুহূর্তে বেকারত্ব কমছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আবার খুলতে শুরু করেছে এবং শেয়ারবাজার চাঙ্গা হচ্ছে।
পরিবেশ :ক্ষমতা গ্রহণের পর বাইডেন পরিবেশ-সংক্রান্ত নীতি সংস্কারে উদ্যোগী হয়েছেন। তিনি দ্রুত প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে আমেরিকাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন, কিস্টোন এক্সএল তেলের পাইপলাইন নির্মাণের কাজ বাতিল করে দিয়েছেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া কিছু কিছু আইনবিধি আবার ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। গত সপ্তাহে তিনি আমেরিকার কার্বন নির্গমনের মাত্রা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ ভাগ কমিয়ে ২০০৫ সালের চেয়েও তা কমনোর অঙ্গীকার করেছেন।
পররাষ্ট্রনীতি :বাইডেনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহারের চূড়ান্ত পর্যায় নিশ্চিত করা। ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিতে ফেরার ব্যাপারে আলোচনার প্রক্রিয়া বাইডেন তেমন দ্রুততার সঙ্গে শুরু করতে পারেননি। এখানে তিনি খুব বড় চমক দেখাতে পারেননি। বাইডেন তার পূর্বসূরির তুলনায় রাশিয়ার প্রতি আরো কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দল চীনা প্রতিনিধিদের সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে বাগ্যুদ্ধে জড়িয়েছে। বাইডেন প্রশাসন আমেরিকার মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে একজোট হয়ে স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোকে মোকাবিলার লক্ষ্যে একটা জোটবদ্ধ উদ্যোগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
বাণিজ্য :প্রবীণ রাজনীতিক বাইডেন তার প্রথম ১০০ দিনে ট্রাম্পের আনা পরিবর্তনগুলো বদলানোর খুব একটা উদ্যোগ নেননি। চীনের ওপর শুল্ক তিনি বজায় রেখেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে অ্যালুমিনিয়াম বাণিজ্যে তিনি আবার শুল্ক বসিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটেনের ক্ষেত্রে তিনি কিছু কিছু শুল্ক শিথিল করেছেন বটে, কিন্তু বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় শুল্ক ব্যবহারের ট্রাম্প নীতি থেকে সরে আসার ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ অন্তত প্রথম ১০০ দিনে তিনি দেখাননি।
