বরেণ্য নির্মাতা সত্যজিত্ রায় পরিচালিত ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় অভিনয় করে আন্তর্জাতিক অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি পান বাংলাদেশের খ্যাতিমান অভিনেত্রী ববিতা। গতকাল ছিল সত্যজিত্ রায়ের শততম জন্মবার্ষিকী। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পেয়েছিল সিনেমাটি। ৭ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও আজীবন সম্মাননা প্রাপ্ত অভিনেত্রী ববিতা সত্যজিত্ রায়ের জন্মশতবর্ষে কথা বললেন—
অশনি সংকেত সিনেমার শুটিং শেষ হওয়ার পরও আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ হতো মানিকদার সঙ্গে। চিঠিতেই বেশি যোগাযোগ হতো আমাদের। একবার আমি তাকে লিখলাম, ‘এখানকার পরিচালকরা আমাকে মোটা হতে বলেছেন। তাই আমি নিয়মিত পান্তা ভাত খাওয়া শুরু করেছি।’ মানিকদা চিঠির উত্তরে লিখলেন, ‘তুই মোটা হবি না। যেমন আছিস তেমনই থাক। তুই খবরদার পান্তা ভাত খাবি না।’
অশনি সংকেত সিনেমার শুটিংয়ের সময় ঈদ পড়েছিল। তখন আমার খুব মন খারাপ। সবাইকে ছেড়ে একা একা আছি। মানিকদা বিষয়টি বুঝতে পেরে আমার জন্য অনেককিছু রান্না করালেন। তারাবাতি, আতশবাজি ফোটানো হলো। মনের কথা বুঝতে পারতেন।
যতবারই কলকাতা গেছি মানিকদার জন্য ইলিশ মাছ আর চিংড়ি মাছ নিয়ে গেছি। খুব পছন্দ করতেন তিনি। সব ভুলে গেলেও ইলিশ মাছ নিয়ে যেতে ভুলিনি। দিল্লি, মুম্বাইয়ে যেখানেই কাজ থাকুক তার বাসায় গেছি, দেখা করেছি, তারপর অন্য কাজে গিয়েছি।
অশনি সংকেত সিনেমাটি মুক্তির পর আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পেয়ে গেলাম। বলিউড থেকে অভিনয়ের বিষয়ে ভালো ভালো প্রস্তাব এসেছিল মানিকদার মাধ্যমে। তারা বাংলাদেশেও এসেছিলেন আমার সঙ্গে মিটিং করার জন্য। তাদের বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলাম, এখন বলিউডে গিয়ে সিনেমা করতে পারবো না। তার কারণ ছিল সেই সময় সুচন্দা আপা জহির ভাইয়ের (জহির রায়হান) বিষয়ে অস্থির ছিলেন। এমন একটা অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন। এছাড়াও বলিউডে সিনেমা করতে রাজি হইনি কারণ দেশের সিনেমার প্রতি ছিল গভীর ভালোবাসা।
মানিকদার কারণে বিশ্বের নামিদামী ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। সেসব অনুষ্ঠানে আমার অভিনীত অশনি সংকেত সিনেমাটি প্রদর্শিত হয়েছে। আমার অভিনয়ের প্রশংসা করেছে বিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক, বোদ্ধারা। এটা ক’জনের ভাগ্যে জোটে। নিউইয়র্ক টাইমস, লন্ডন, জার্মানির বিখ্যাত নামিদামী পত্রিকার প্রচ্ছদে আমি এসেছি সে সময়। বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে নিমন্ত্রিত হয়েছি। সেখানে ‘গোল্ডেন বিয়ার’ দেওয়া হয়েছিল সিনেমাটিকে। রাশিয়াতে রাস্তায় রাস্তায় আমার ছবি বিলবোর্ডে দেখেছি। সোভিয়েত ইউনিয়নে অনেকবার আমন্ত্রিত হয়ে গেছি। সত্যজিত্ রায়কে দিয়ে বাংলাদেশের একটি পরিচালনা করানোর খুব ইচ্ছা আমার মনের গভীরে ছিল। কথাও বলেছিলাম মানিকদার সঙ্গে। তারপর তো মানিকদা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমার ইচ্ছাটা আর পূরণ হলো না। অশনি সংকেত সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব যখন এসেছিল তখন আমরা পুরান ঢাকায় থাকতাম। তখন কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করেছি মাত্র। একদিন আমাদের সেই বাসায় একটি চিঠি এলো। চিঠির বিষয় ছিল সত্যজিত্ রায়ের সঙ্গে দেখা করা নিয়ে। প্রথমে ভেবেছিলাম কেউ মজা করেছে। পরে বরেণ্য এই পরিচালকের সঙ্গে সিনেমায় অভিনয়ের বিষয়ে কথা বলতে ভারতে গিয়েছিলাম।
তখন আমার বয়স ১৬-১৭ বছর। আমি আর সুচন্দা আপা গিয়েছিলাম কলকাতা সত্যজিত্ রায়ের সঙ্গে দেখা করতে। এতটা গভীর আর মুগ্ধকর স্মৃতি তিনি আমাকে দিয়ে গেছেন, যা বারবার আমাকে তাড়িত করে।
