স্পোর্টস ডেস্ক
১৩ বছর আগে ম্যানচেস্টারের মধ্যবিত্ত ক্লাব সিটির মালিকানা নিয়ে নেন আমিরাতের ধনকুবের শেখ মনসুর। অঢেল টাকা-পয়সা থাকার সুবাদে রাতারাতি সাফল্য পেতে তিনি একের পর এক তারকা খেলোয়াড়কে কিনে আনেন। নিয়োগ দেন ইউরোপের হাই-প্রোফাইল কোচদের। সেই সৌজন্যে ঘরোয়া ফুটবলে সব শিরোপা স্বাদ নেওয়া হয়ে গেলেও, সিটির দুঃখের জায়গা ছিল ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চ চ্যাম্পিয়নস লিগ। শিরোপা জয় তো পরের কথা কখনো ফাইনালেই ওঠা হয়ে উঠছিল না সিটির।
এবার আরেক ধনকুবের ক্লাব পিএসজিকে হারিয়ে সেই আক্ষেপও ঘোচাল ম্যানসিটি। মঙ্গলবার রাতে ফ্রান্সের কাতারি মালিকানাধীন ক্লাব পিএসজিকে সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগে ২-০ গোলে হারিয়ে স্বপ্নের ফাইনালে উঠে গেছে সিটি। রিয়াদ মাহরেজের জোড়া গোলের সুবাদে ৪-১ গোলের অগ্রগামিতা নিয়ে এখন ইস্তাম্বুলের পথে গার্দিওলার সিটিজেনরা।
দুটি এওয়ে গোলের সুবিধা নিয়ে ঘরের মাঠে খেলতে নামা ম্যানচেস্টার সিটির সামনে এদিন পিএসজি কোনো সুবিধাই করতে পারেননি। বল পজিশনে এগিয়ে থাকলেও নেইমার-ইকার্দিদের পুরোটা সময় বোতল বন্দি করে রাখেন রুবেন ডিয়াজ, জন স্টোনসরা। সিটির বিপক্ষে গোলমুখে তাই কোনো শটই তো নিতে পারেননি পিএসজির কেউ। দলের সঙ্গে ইতিহাদে আসলেও, ইনজুরির কারণে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে মাঠেই নামাতে পারেননি কোচ মরিসিও পচেত্তিনো। তবে এই ফরাসি তারকা থাকলেও, সিটির এই রক্ষণ দুর্গের সামনে কী-ই বা করতে পারতেন তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কেননা ম্যাচে দুই গোল করা রিয়াদ মাহরেজকে ছাপিয়ে যে ম্যাচসেরা হয়েছে দলটির প্রধান রক্ষণ সৈনিক ডিয়াজ!
সিটি তাদের অগ্রগামিতা বাড়ায় ম্যাচের ১১ মিনিটেই। রক্ষণে পাস খেলতে খেলতে হঠাত্-ই সিটির কিপার এডারসন নিজের ডি বক্স থেকে লম্বা বল বাড়ান পিএসজির অর্ধে। সে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে জিনচেনকো পিএসজি ডি বক্সের বাইরে থাকা কেভিন ডি ব্রুইনার উদ্দেশে বাড়ান। ব্রুইনার শট ডিফেন্ডার মারকিনিয়োস ব্লক করলেও, ফিরতি বল থেকে মাহরেজের শট কেউ থামাতে পারেননি। দ্বিতীয় গোলটা এই আলজেরিয়ান করেন ম্যাচের ৬৩ মিনিটে। আবারো গার্দিওলার দুর্দান্ত কৌশলে মার খেয়ে যায় পিএসজির রক্ষণ। দুর্দান্ত এক প্রতিআক্রমণে ফিল ফোডেন বল টেনে নিয়ে বক্সের সামনে আবার বল দেন ডি ব্রুইনাকে। এবার এই বেলজিয়ান শট না নিয়ে বক্সে ঢুকে পড়া ফোডেনের উদ্দেশে বাড়ান। তার মাটি ঘেঁষা ক্রস দূরের পোস্টে ফাঁকায় পেয়ে আবার নাভাসকে পরাস্ত করেন মাহরেজ।
মাহরেজের দ্বিতীয় গোলে সিটি ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতেই মেজাজ হারিয়ে বসেন পিএসজির ফুটবলাররা। লড়াই করবে কী, উল্টো ফাউলের নেশা চেপে বসে তাদের মাথায়। শুরুটা করেন আর্জেন্টাইন তারকা ডি মারিয়া। সিটির অধিনায়ক ফার্নানদিনিওর পায়ে লাথি মেরে লাল কার্ড দেখেন তিনি। সেই জেরে নিজের ক্ষোভ জানিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন পিএসজির মার্কো ভেরাত্তি। একটু পর এই ইতালিয়ান মিডফিল্ডারের ফাউলের শিকার হয়ে ফিল ফোডেন যখন মাটিতে গড়াচ্ছেন তখন পিএসজির আরেক আর্জেন্টাইন লিয়ান্দ্রো পারেদেস তার দিকে বল ছুড়ে মারেন। এটা দেখে আবার চেঁচামেচি করতে শুরু করলেন সিটির লেফটব্যাক জিনচেনকো। রেফারি না পেরে তাকেও দেখান হলুদ কার্ড। পরের মিনিটে আবার ভেরাত্তি এমন এক ফাউল করে বসলেন, দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে যে তাকে মাঠ ছাড়তে হয়নি এ জন্য রেফারির কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার কথা তার।
এমন নাটকীয় সব ঘটনার পর অসম্ভবকে আর সম্ভব করা হয়নি পিএসজির পক্ষে। উলটো নেইমার-ইকার্দিদের নিদারুণ বাজে পারফরম্যান্সে বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখের মতো দলকে হারিয়ে সেমিতে এসেও টানা দ্বিতীয় ফাইনাল খেলা হলো না পারিসিয়ানদের।
সংখ্যাতত্ত্বে
২ কোনো ইংলিশ ক্লাবের দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগের দুই লেগেই গোল করলেন রিয়াদ মাহরেজ। এর আগে, ২০১৭-১৮ মৌসুমে লিভারপুলের সাদিও মানে এই প্রতিযোগিতার সেমির দুই লেগেই পেয়েছিলেন গোলের দেখা। কাকতালীয় ব্যাপার, এই দুই ফুটবলারই আবার আফ্রিকান।
৯ নবম ইংলিশ ক্লাব হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে উঠল ম্যানচেস্টার সিটি। অন্য কোনো দেশের এতগুলো ক্লাব কখনো ওঠেনি এই টুর্নামেন্ট ফাইনাল। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জার্মানি ও ইতালির ৬টি করে ক্লাব খেলেছে এই আসরের ফাইনালে।
১১ ইংলিশ ক্লাব হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগের এক মৌসুমে এখন সর্বোচ্চ জয় ম্যানচেস্টার সিটির। ইউরোপ সেরার এই প্রতিযোগিতায় এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি জয়ের রেকর্ড রিয়াল মাদ্রিদের। ২০০১-০২ মৌসুমে লস ব্লাঙ্কোরা জিতেছিল ১২ ম্যাচ। এবার শিরোপা হাতে তুলতে পারলে সিটিজেনরা রিয়ালের সে রেকর্ডে ভাগ বসাবে।
১২ পেপ গার্দিওলার বিপক্ষে মরিসিও পচেত্তিনোর হারের সংখ্যা। কোচ হিসেবে গার্দিওলার মুখোমুখি হয়েই সবচেয়ে বেশিবার হেরেছেন পচেত্তিনো। এদিকে, গার্দিওলাও জয়ের রেকর্ড গড়েছেন। ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনি, সেন ডায়চের পর পচেত্তিনো বিপক্ষেও মুখোমুখি দেখায় সর্বোচ্চ ১২ জয়ের রেকর্ড গড়লেন তিনি।
৩৬ জন্মদিনে খেলতে নেমে যৌথভাবে সবচেয়ে বেশি বয়স্ক ফুটবলার হিসেবে জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছেন ম্যানচেস্টার সিটির মিডফিল্ডার ও অধিনায়ক ফের্নানদিনিও। তার আগে রেকর্ডটি ছিল বায়ের লেভারকুসেনের খেলোয়াড় উলফ কার্সটেনের দখলে।
