বন্ড লাইসেন্স সংক্রান্ত জটিলতায় কাঁচামাল সরবরাহ আটকে যাওয়ায় জটিলতায় পড়েছে অনেক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা কাঁচামাল কিংবা কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্য কেবল একই ধরনের সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করতে পারবে। তবে রপ্তানিকারকরা বলছেন, ২০১২ সালের এক আদেশের মাধ্যমে বেশ কিছু এক্সেসরিজ পণ্যসামগ্রী বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত নয়, এমন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা যেত। শুধু তাই নয়, এর আওতায় বিশেষায়িত কিছু সুতা কিংবা কাপড়ও সরবরাহ করা হতো বলে রপ্তানিকারকদের দাবি। এতদিন তা অনুমোদন দিয়ে আসছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন বন্ডেড কমিশনারেট অফিস। কিন্তু সম্প্রতি হঠাত্ করেই এই ইউপি সুবিধা (ইউটিলিটি পারমিশন বা কাঁচামালের প্রাপ্যতার অনুমোদন) বন্ধ করে দিয়েছে বন্ড অফিস। ফলে বন্ড লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানে আটকে গেছে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কাঁচামাল সরবরাহ।
এর ফলে প্রত্যক্ষ রপ্তানি করে না, এমন তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। তারা জানিয়েছেন, এর ফলে কয়েক শ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি বন্ধের উপক্রম হয়েছে। এই ইস্যুতে উদ্বেগ জানিয়ে গত রবিবার বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের তিন সংগঠন ঢাকা ও চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট অফিসে চিঠি দিয়েছে।
তবে শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বন্ড সুবিধার আওতায় আনা পণ্য নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হলে এর ফলে অনিয়ম তথা শুল্ক ফাঁকির আশঙ্কা রয়েছে। এজন্যই বিদ্যমান বন্ড নীতিমালায়ও এ ধরনের সরবরাহের ক্ষেত্রে ইউপি জারি বন্ধ করা হয়েছে।
চিঠিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্সধারী সব প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হতে বন্ড লাইসেন্সবিহীন শতভাগ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে উত্পাদিত সব ধরনের পণ্য ও সেবা সরবরাহের ক্ষেত্রে আগের সুবিধা বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে। এতে বলা হয়, হঠাত্ করে এ সুবিধা বন্ধ হওয়ার ফলে অনেক নন-বন্ডেড প্রত্যক্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে দেশের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিশালসংখ্যক শ্রমিক বেকার হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে রপ্তানি আদেশ রয়েছে, কিন্তু কাঁচামালের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা রপ্তানির জন্য পণ্য উত্পাদনে যেতে পারছে না।
রপ্তানিকারকদের শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির অনুমতি দিয়ে আসছে সরকার। তবে শর্ত হলো, এসব কাঁচামাল আমদানি করে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট নির্ধারিত গুদাম বা ওয়্যারহাউজে রেখে তা দিয়ে তৈরি পণ্যের পুরোটাই রপ্তানি করতে হবে। এটি বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা বা বন্ড সুবিধা নামে পরিচিত। কিন্তু এতদিন ব্যাক টু ব্যাক এলসির বিপরীতে নন-বন্ড প্রতিষ্ঠানে পণ্য সরবরাহ করতে পারত প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক বন্ডেড প্রতিষ্ঠান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১২ সালে এক আদেশের মাধ্যমে এনবিআর বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্সধারী প্যাকেজিং, হ্যাঙ্গার ও প্লাস্টিক পণ্য উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান হতে বন্ড লাইসেন্সবিহীন শতভাগ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে এক্সেসরিজ পণ্য (কার্টন, হ্যাঙ্গার, প্লাস্টিক পণ্য) সরবরাহ করা যাবে। তবে বর্তমানে রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এবং বিদেশি ক্রেতার চাহিদার ভিত্তিতে নতুন নতুন পণ্য যুক্ত হচ্ছে।
নন-বন্ড প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানার সংখ্যাই বেশি। বিকেএমইএর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সংগঠনটির সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশেরই বন্ড লাইসেন্স নাই। তারা দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্য রপ্তানি করে।
বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ইত্তেফাককে বলেন, বন্ড কমিশনারেট অফিসের এ সিদ্ধান্তের কারণে ৩০০ পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর ফলে রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কার কথা জানান তিনি। দ্রুত এ সমস্যা সমাধানে উপায় বের করার দাবি জানান তিনি।
অবশ্য ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট অফিসে সদ্য যোগদান করা কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান থেকে নন-বন্ড প্রতিষ্ঠান পণ্য বা কাঁচামাল সরবরাহের আইনগত কোনো সুযোগ নেই। কী উপায়ে তারা এতদিন এ সুবিধা পেয়ে আসছিল তা আমরা দেখব। তবে এ সংক্রান্ত চিঠি এখনো পাননি বলে জানান তিনি।
