সিনেমার জাদু জমছে না কেন?

আপডেট : ০৯ মে ২০২১, ২১:৩৪

সত্যজিত্ রায় মাত্র ৩২ বছর বয়সে ‘পথের পাঁচালি’র শুটিং শুরু করেছিলেন নিজের আত্মবিশ্বাস থেকে। সত্যজিত্ সফল হয়েছিলেন অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে। সেই চিত্র কিন্তু এখনো বদলায়নি। চব্বিশ ফ্রেমের সেলুলয়েড থেকে সিনেমা এখন ডিজিটাল হয়েছে। এটা একধরনের বিপ্লব। প্রযুক্তির বিপ্লব। ডিজিটাল প্রযুক্তি সিনেমা নির্মাণের কারিগরি দিকের যে বিপ্লব ঘটিয়েছে, তাতে তুলনামূলক স্বল্পবাজেটেও চমকে দেওয়ার মতো ছবি নির্মাণ করা সম্ভব। কিন্তু একটি গল্প কবিতা লেখার সঙ্গে ছবি বানানোর সবচেয়ে বড়ো পার্থক্য হলো এর মাধ্যম। সামান্য কয়েকশো টাকায় দিস্তা-দিস্তা কাগজ-কলম ফুরিয়ে লেখার প্রাকটিস করা যায়। কিন্তু সিনেমার প্রাকটিস করার মূল্য এর কয়েক হাজার গুণ বেশি। সুতরাং আমাদের মতো দেশে সিনেমার প্রাকটিসের সুযোগ নেই।

ধরা যাক একজন তরুণ নির্মাতা স্বপ্ন দেখতে শুরু করল একটি ভালো সিনেমা নির্মাণের। এটা অসম্ভব কিছু না বটে। তবে ঐ নির্মাতাকে মনে রাখতে হবে—তিনি এমন এক যুদ্ধে নামছেন—যেখান থেকে জয় ছিনিয়ে আনার মতো স্কুলিং তিনি পৃথিবীর আর কোথাও পাবেন না। স্বাধীন পরিচালক হিসেবে, সিন্ডিকেটের বাইরে থেকে (সিন্ডিকেটে অনেকে ঢুকতে চান না, আবার চাইলেই সিন্ডিকেটে ঢোকা যায় না), অর্থ জোগাড় করে, প্রি-প্রডাকশন, কাস্টিং, রিহার্সেল, শুটিং ও পোস্ট প্রডাকশন শেষ করে সিনেমাটা প্রদর্শনের জন্য উপযুক্ত করার পথে পথে বিছানো রয়েছে শত শত কাঁটা। সেসব কাঁটা মাড়িয়ে রক্তাক্ত হয়ে কোনো নবীন নির্মাতা যখন এই ভেবে আত্মতৃপ্তি পেতে চাইবেন—অবশেষে একটি সিনেমা বানানোর যুদ্ধ শেষ করলেন তিনি—তবে তিনি বোকার স্বর্গেই থেকে যাবেন। আসলে ওটা যুদ্ধের শেষ নয়, মধ্যবিরতি মাত্র। ছবির সেন্সর করানোর যুদ্ধ, দর্শকের কাছে পৌঁছানোর যুদ্ধ, প্রদর্শনীর জন্য প্রেক্ষাগৃহ পাবার যুদ্ধ, মার্কেটিংয়ের যুদ্ধ, লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত পাবার যুদ্ধ—কত যুদ্ধ তখনো বাকি। বাংলাদেশে এসব যুদ্ধ এমনই বৃত্তের পর বৃত্তের ভেতরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে যে, সেখানে প্রবেশপথের দরজাগুলো থাকে শক্তহাতে বন্ধ।

সুতরাং নবীন নির্মাতা ও তার প্রযোজককে লম্বা দম নিয়ে, হারকিউলিসের মতো উদ্যম নিয়ে, ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে মনে রাখলে ভালো হবে—এটি এক মহাঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্র। ডুবে মরার সম্ভাবনা ষোলো আনা। কেবল সাঁতার জানলেই হবে না, একই সঙ্গে নামতে হবে মোরগ লড়াইয়ে। যদিও রুচিগতভাবে অমন মোরগ লড়াইয়ের বৃত্তে ঢুকতেই চাইবেন না কোনো সৃজনশীল মানুষ। কিন্তু ঢুকতে তাকে হবেই। কারণ, সিনেমার সঙ্গে যে পুঁজি জড়িয়ে থাকে—তা হিমঘরে আটকে থাকলে তরুণ স্বাধীন পরিচালকের শিল্পসত্তার মৃত্যুঘণ্টা বাজতে শুরু করবে।

কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণে উত্সাহ দিতে ১৯৭৬ সালে চালু হয় সরকারি অনুদান প্রথা। ঐ বছর আড়াই লাখ টাকা করে অনুদান পায় মশিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীর ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’। মশিহউদ্দিন শাকের সম্প্রতি এ ব্যাপারে একটি জাতীয় দৈনিকে জানিয়েছেন, আড়াই লাখে তো ছবি হয় না, ধারদেনা করে আবার ছবি করি। প্রায় ১০ লাখ লেগেছে। ১৯৭৮ সালের শেষ দিকে বিয়ে করলেন তিনি। কিছুদিনের মধ্যে স্ত্রীর বাবা মারা গেলে তাঁর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাও লগ্নি করেন সিনেমা বানাতে। স্ত্রী বাংলাদেশ বিমানে কাজ করতেন, তার আয়ের এক অংশ স্বামীর সিনেমা তৈরিতে বিনিয়োগ করেন। ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। নির্মাতার আশা ছিল—দেশব্যাপী ছবিটি মুক্তি পাবে। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর রিলিজের পর ঢাকায় কোনো হল পায়নি ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’। নাটোর শহরের একটি হলে মুক্তি দেওয়া হয়। তাও কেবল শুক্র, শনিবার।

সিনেমা একই সঙ্গে শিল্প এবং ব্যবসা। যেহেতু এখানে পুঁজির লগ্নি ঘটে, সে কারণে লগ্নিকৃত অর্থ তুলে আনার পাশাপাশি মুনাফার প্রবণতা থাকাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। আর প্রায় সব লগ্নিকারকের কাছেই সিনেমাটা কেবলই অর্থ উপার্জনের একটি খাত মাত্র। গত শতকের চল্লিশের দশকে বাংলা ভাষায় সবাক সিনেমা নির্মাণ শুরুর পর ছবি প্রদশর্নীর প্রেক্ষাগৃহের রমরমা শুরু হয়। ষাটের দশকে টেলিভিশন, আশির দশকে ভিসিপি আসার পরও প্রধান বিনোদন বলতে বোঝানো হতো সিনেমাকে। সেই কারণে নব্বইয়ের দশকে স্যাটেলাইট টেলিভিশনের যুগে প্রবেশের আগে দেশ জুড়ে সিনেমা প্রদর্শনীর প্রেক্ষাগৃহ তৈরির হিড়িক পড়ে যায়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সারা দেশে সিনেমা হল ছিল ১ হাজার ৪৩৫টি। তারপর যখন ঘরে বসেই স্যাটেলাইট টেলিভিশনের মাধ্যমে হিন্দি-ইংরেজি-বাংলা ছবি দেখার জানালা খুলে যায়, তখন ক্রমশ বন্ধ হওয়া শুরু করে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা। মধ্যবিত্ত দর্শকশ্রেণি বুঝতে পারেন দেশের প্রথাগত বাণিজ্যিক ছবি কতটা সাধারণ মানের। তারা হলবিমুখ হতে শুরু করেন। আর সেই সময় একটি বিশেষ শ্রেণির দর্শকদের মন জোগাতে চলচ্চিত্রে ঢুকে পড়ে অশ্লীলতা। বাণিজ্যে ক্রেতার চাহিদাই শেষ কথা। সুতরাং বিশেষ শ্রেণির কিছু নিম্নবিত্ত দর্শক যখন অশ্লীলতাকে গ্রহণ করলেন, তখন এর একটি বাজার চাহিদা তৈরি হলো। শুরু হলো বাংলা সিনেমার অশ্লীল ও কাটপিসের যুগ। কিন্তু বাজার অর্থনীতিতে এরা গরিব ভোক্তা। সুতরাং কমাতে হলো নির্মাণ ব্যয়। বাড়তে থাকল লোকসানের বোঝা। সুন্দর ছিমছাম প্রেক্ষাগৃহ হয়ে পড়ল অশ্লীল দর্শকদের আখড়া। এবং এরপর থেকে কমতে শুরু করল সিনেমা হলের সংখ্যা। এক যুগ আগে যখন মাল্টিমিডিয়া যুক্ত মোবাইল ফোনসেট জনপ্রিয় হতে শুরু করল, তখন অশ্লীল দর্শকরাও ক্রমশ হলবিমুখ হতে লাগল। কারণ সেটা তারা মোবাইলেও পেয়ে যাচ্ছেন। আর ততদিনে একটি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত প্রজন্ম বড় হয়ে উঠেছে বড়পর্দায় সিনেমা না দেখে, প্রেক্ষাগৃহে ভালো পরিবেশ নেই বলে। এরপর ভালো সিনেমা হলের সংখ্যা কমতে কমতে এখন একশোর ঘরে নেমে এসেছে। গত দুই দশকে দেশের কোথাও চালু হয়নি নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ সিনেমা হল। একের পর এক সিনেমা হল ভেঙে ফেলে নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন। বছরে দুই ঈদ ছাড়া এখন অন্য কোনো সময় দর্শক সিনেমা হলে খুব বেশি আসেন না। তার কারণ বুঝতে নভোযান বিজ্ঞানী হতে হয় না। ইন্টারনেটের যুগে বিশ্বগ্রামের যেকোনো কিছু একজন দর্শক নিজের পছন্দমতো দেখতে পাচ্ছেন। তুলনা করতে পারছেন আমাদের সিনেমা কোথায় পড়ে আছে আর বিশ্বসিনেমা কোথায় চলে গেছে। সুতরাং এ শিল্পের সবাই বুঝে গেছেন, মানসম্মত ছবি না পাওয়া গেলে সিনেমা হলের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

কিন্তু পাশের দেশ ভারতে কী করে সিনেমার প্রসার ঘটছে আরো বেশি করে? বলিউডের বাণিজ্যিকভাবে সফল ছবিগুলোর বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন দেখলে এর উত্তর মিলবে সহজেই। আর্ট এবং বাণিজ্যকে একই সঙ্গে সমান মাত্রায় গুরুত্ব দিয়েছে তারা। জনপ্রিয়তার চেনাপথে হেঁটে এখন সহজে সফল হওয়া যায় না। বলিউডের বক্সঅফিস কাঁপানো

দঙ্গল, পিকে, থ্রি ইডিয়ট দেখলে বোঝা যায় তারা প্রথাগত ধারার বাইরেও বাণিজ্যিক ছবির চিত্রনাট্যের সঙ্গে কত চমত্কারভাবে শিল্পকে মিশিয়ে নিয়েছেন।

অনেক নির্মাতাই মনে করেন, আর্ট ফিল্ম বলে সিনেমার কোনো ধরন নেই। সিনেমায় যেহেতু বিপুল অর্থ লগ্নি করতে হয়—সেটা আর্ট হোক আর কমার্শিয়াল—সেই অর্থটা তুলে আনার ব্যবস্থা থাকতেই হবে। এটা হতো ফোয়ারার জলাধারের মতো। ফোয়ারার পানির উত্স যে জলাধার, ফোয়ারা থেকে ছোটা পানি আবার সেই জলাধারেই এসে মিশছে। না মিশলে ওই জলাধার একসময় জলশূন্য হয়ে পড়তে বাধ্য। তাতে ফোয়ারারও মৃত্যু ঘটবে।

নতুন নির্মাতারা এত কিছু ভেবে ছবি নির্মাণ করতে নামেন না। আসলে এত কিছু ভাবলে ছবি নির্মাণের কাজ শুরুও করা যায় না। এক্ষেত্রে ছবি নির্মাণ হলো ডানায় পাখা লাগিয়ে আকাশে ভাসার মতো। আপনি উড়তে পারেন, আবার মুখ থুবড়ে পড়েও যেতে পারেন। কিন্তু ওড়ার আগে ভুলেও নিচের দিকে তাকানো যাবে না। তাহলে হার্টফেল করবেন।

আরেকটি বড় সমস্যা সেন্সর বোর্ড। আইনটি ব্রিটিশদের তৈরি। সেসময় তাদের নিজেদের প্রয়োজন ও  পরিস্থিতি সাপেক্ষে সেন্সর আইন চালু হয়েছিল। আপনি সিনেমা বানালে সেটার সেন্সর নিতেই হবে। কিন্তু ওটিটি প্লাটফরমে কিংবা ফেসবুক বা ইউটিউবের জন্য কোনো ছবি বানালে সেটা মুক্ত, স্বাধীন। ফেসবুক বা ইউটিউবে তো যে কেউ একটি অ্যাকাউন্ট বা চ্যানেল তৈরি করে বিদেশে বসেই লাইভ প্রোগ্রাম চালিয়ে যেতে পারেন, বাংলাদেশে বসে সেটা দেখতেও পারেন লাখ লাখ মানুষ। এসবের জন্য কোনো সেন্সর লাগে না। কিন্তু সিনেমার সেন্সর আইন যে উদ্দেশ্যে তৈরি, তাতে কিন্তু লাগা উচিত ছিল। আবার এক্ষেত্রে সেন্সর না লাগলে সিনেমার ক্ষেত্রেও সেন্সর লাগা উচিত না। আসলে, তথ্যপ্রযুক্তি এখন মানুষকে নিয়ে গেছে বাস্তবের কল্পবিজ্ঞান জগতে, কিন্তু আমরা এখনো পড়ে আছি সেই রাক্ষস-খোক্ষসের যুগে।

করোনার জন্য সিনেমা হল অনেকদিন ধরে বন্ধ। মাঝখানে সামান্য কিছুদিনের জন্য খুলেছিল অবশ্য। করোনা চিরকাল থাকবে না। কিন্তু করোনার কারণে পরিবর্তিত ওটিটি প্লাটফরম ও ওয়েবসিরিজ আমাদের সিনেমার জগতে নতুন একটি ধারা তৈরি করে ফেলেছে। একই মদ নানান বোতলে নানান মাপে ঢেলে পরিবেশন করা আরকি। তারপরও বলতে হয়, সিনেমার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়বে না। মনে রাখতে হবে, ছোট্ট সেলফোনে ছবি দেখা আর অন্ধকার ঘরে নিজের আকারের চেয়ে তিনগুণ বড় স্ক্রিনের সামনে সাররাউন্ডিং সাউন্ড সিস্টেমের ভেতরে বসে ছবি দেখার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আধুনিক সিনেপ্লেক্সে বসে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত দর্শক মানসম্মত সিনেমা দেখার সুযোগ পেলে সেটা একসময় চা পানের মতো নিত্যঅভ্যাসে পরিণত হবে। সেটা দক্ষিণ ভারতে হয়েছে। ইউরোপ আমেরিকাতেও হয়েছে। সেখানে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখাটা তাদের নিত্যদিনের বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সিনেমার মধ্যে যেই ইল্যুশন ও ম্যাজিক আছে, সেই ম্যাজিক উন্নত প্রযুক্তির মিশিলে তৈরি প্রেক্ষাগৃহে বড় পর্দায় বসে একবার যিনি দেখবেন, তিনি সেই ম্যাজিকে মজবেনই। দুঃখের বিষয় হলো, এই ম্যাজিকটা আমরা ঠিকমতো ধরতে পারছি না, উপস্থাপনও করতে পারছি না।