করোনাকালের ঈদুল ফিতর :সর্বোচ্চ সহমর্মিতা দরকার

আপডেট : ১১ মে ২০২১, ২১:২৪

করোনাকালে এই বত্সরও ভিন্ন অবয়বে উদ্যাপিত হইতে যাইতেছে মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় উত্সব পবিত্র ঈদুল ফিতর। আরবি শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামীকাল বা পরশু ঈদুল ফিতর পালিত হইবে। এই ঈদ এমন এক সময়ে উদ্যাপিত হইতেছে যখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলিতেছে এবং তৃতীয় ঢেউয়ের প্রতিধ্বনি শুনা যাইতেছে। করোনা-সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটে দেশের মানুষ নানাভাবে দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হইয়াছেন। ঈদ ঐক্য, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। তাই এই দুঃসময়ে আমাদের উচিত গরিব-দুঃখী, অভাবী, ছিন্নমূল, দিনমজুর ও বেকারদের পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়ানো। জাকাত ও ফিতরার পরিকল্পিত বণ্টনের মাধ্যমে তাহাদের মুখে হাসি ফুটানো এবং সম্মিলিত উদ্যোগে তাহাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

গত বত্সরের মতো এইবারও স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখিয়া আমাদের ঈদুল ফিতর পালন করিতে হইবে। প্রকৃতপক্ষে মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার শেষে শাওয়ালের নূতন চাঁদ লইয়া আসে পরম আনন্দ। রোজাদারগণ যে পরিচ্ছন্নতার ও পবিত্রতার সৌকর্য দ্বারা অভিষিক্ত হন, যে আত্মশুদ্ধি, সংযম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, উদারতা, বদান্যতা, মহানুভবতা ও মানবতার গুণাবলি দ্বারা উদ্ভাসিত হন, ইহার গতিধারা অক্ষুণ্ন রাখিবার শপথ গ্রহণের দিন পবিত্র ঈদুল ফিতর। শাব্দিক অর্থে ঈদ মানে আনন্দ হইলেও প্রকৃত বিবেচনায় ঈদ শুধু একটি আনন্দময় দিবস নহে, বরং একটি ইবাদত। মহান আল্লাহর স্মরণ, তাহার জিকির, তাহার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বকে সম্মুখে রাখিয়া সম্মিলিত আনন্দের পরিবেশ গড়িয়া তুলিতে হয়। মূলত প্রভুর দরবারে রোজা, তারাবিহ, রহমত, মাগফিরাত, নাজাত, শবেকদরের মতো হাজার মাসের চাইতেও উত্তম রাত্রি প্রাপ্তি—এই সকল নিয়ামতের কারণে বান্দার মনে যে আনন্দের জোয়ার সৃষ্টি হয়, তাহারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ঈদের দিবসে। তাই মুমিনের ঈদ মানে আল্লাহর নিয়ামত প্রাপ্তির আনন্দ, মহান আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের এক মহা আয়োজন।

সওম বা রোজার বিধান কেন দেওয়া হইল? হজরত আদম (আ.) হইতেই রোজার বিধান চলিয়া আসিতেছে। এই রোজার এক নম্বর উদ্দেশ্য হইল মুত্তাকি বা পরহেজগার হওয়া। তবে অন্যতম উদ্দেশ্য হইল মানুষ যাহাতে ক্ষুধাতুরের জ্বালা অনুভব করিতে পারে। কবি বলিয়াছেন, ‘চিরসুখীজন ভ্রমে কি কখন/ ব্যথিত বেদন বুঝিতে কি পারে।/ কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে/ কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।’ অর্থাত্ যিনি ভুক্তভোগী তিনিই ইহার মর্মযাতনা অধিক উপলব্ধি করিতে সক্ষম। তেমনিভাবে যাহারা বুভুক্ষ ও ক্ষুধাকাতর, ক্ষুধার যন্ত্রণা সম্পর্কে তিনিই ওয়াকিবহাল। ক্ষুধার যাতনায় রসুলুল্লাহ (সা.) ও তাহার সাহাবিরা পেটে পাথর পর্যন্ত বাঁধিয়াছেন। এবার ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করিয়া জমানো সঞ্চয় লইয়া এবং দুর্ভোগ-কষ্ট স্বীকার করিয়া পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সহিত ঈদ করিবার জন্য ছুটিয়া চলিয়াছে গ্রামগঞ্জে। ঈদ উপলক্ষ্যে এই যে মরণ বা ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা তাহা হইতে প্রমাণিত হয়, এইখানকার ধর্মপ্রাণ মানুষ ঈদকে দেখেন একটি পারিবারিক মিলনমেলা হিসাবেও। নাড়ির টানে এইভাবে গ্রামগঞ্জে ঈদ করিতে ছুটিয়া চলা একটি অনন্য ঘটনা। ভারতীয় উপমহাদেশেই কেবল ইহার নজির চোখে পড়ে। ঈদের ছুটিতে আর কোথাও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় বলিয়া মনে হয় না।

ইতিমধ্যে করোনায় আমরা আমাদের অনেক প্রিয়জনকে হারাইয়াছি। তাই অনেকের মন ব্যথা-বেদনায় ভারাক্রান্ত। তাহা সত্ত্বেও বালা-মুসিবতকে আল্লাহর পক্ষ হইতে আমাদের কৃত অন্যায়ের সাজা বা পরীক্ষা হিসাবে মানিয়া লইয়া তাহার নিকট সকল গুনাহ মাফের জন্য প্রার্থনা করিতে হইবে। এই আপদ মুক্তির কামনার মধ্য দিয়া উদ্যাপিত হউক এবারের ঈদুল ফিতর। সকলকে জানাই পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।