যোবায়ের ইবনে আলী
করোনার এই ক্রান্তিলগ্নে বন্ধ হয়ে আছে ক্যাম্পাসগুলো। স্কুল-কলেজসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রমও স্থবির হয়ে আছে দীর্ঘ চৌদ্দ মাস ধরে! একাকী থাকতে থাকতে মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। স্কুল-কলেজের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পার্থক্য হলো সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং আড্ডার সময়গুলো।
গত মার্চ মাস থেকে বন্ধ হয়ে আছে দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। দীর্ঘদিনের একাকীত্ব গ্রাস করেছে শিক্ষার্থীদেরকে। দিনের শেষে সন্ধ্যায় চা আড্ডা, রাত জেগে এসাইনমেন্ট আর কুইজের জন্য চক্র করে পড়তে বসাসহ নানান সব কল্লোলময় মুহূর্ত এখন শুধুই স্মৃতি। যেখানে শিক্ষার্থীরা অধিকাংশ সময় কাটাতেন ক্যাম্পাসে সেখানে ঘরে গৃহবন্দি হয়ে আছেন সবাই। মিস করছে প্রিয় ক্যাম্পাসকে আর বন্ধুদের। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বন্ধু কী সেটা করোনা মহামারি না আসলে কেউ হয়তো উপলব্ধিই করতে পারত না। উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল এমন কী নেপাল, সোমালিয়াসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা পড়তে আসেন এখানে। তৈরি হয় এক ত্রিমুখী বন্ধুত্বের গল্প। ক্যাম্পাসে ক্লাস শেষে কিংবা অবসরে ক্যাম্পাসে আড্ডা দেওয়া একটুখানি মনে প্রশান্তি এনে দেয় সবার মধ্যে।
সারাদিনের পড়াশোনার পাশাপাশি বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা জমে ওঠে ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের সামনের চায়ের দোকানগুলোতে। করোনায় ক্যাম্পাসের এই বন্ধুগুলোর আড্ডা মিস করছেন সবাই। স্কুল-কলেজের বন্ধুদের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বন্ধুত্বের দিনগুলো সব শিক্ষার্থীর কাছে অনেকটা রোমাঞ্চকর স্মৃতিও বটে।
ক্লাসের অসমাপ্ত লেকচার, টিউটোরিয়াল, এসাইনমেন্ট, বন্ধু ও প্রিয়জনকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সবকিছুই স্থবির হয়ে গেল এক অদৃশ্য শক্তির ভয়াল থাবায়। হাবিপ্রবির বিভিন্ন পয়েন্ট যেমন ডি বক্স, টিএসসি, লাইব্রেরি চত্বর, ওয়াজেদ ভবন ঘেঁষে হাফ ওয়াল, রিমা চত্বর, শহিদ মিনারের সামনে, অডিটোরিয়ামগুলোর সামনের জায়গা, লিচু বাগান, মিনি চিড়িয়াখানা, বিভিন্ন একাডেমিক ভবনে ও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের আড্ডা এবং খোশ গল্পে ভরপুর থাকত তা এখন শুধুই নীরব।
ক্যাম্পাস চলাকালে জন্মদিনের কেক কাটার জন্য বার্থডে চত্বর, টিএসসি, শহিদ মিনার, ডি বক্স, ফিসারিজের পুকুর যেখানে ভিড় পড়ে যেত করোনা সেই আনন্দটুকুও সবার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। প্রথমবর্ষের শুরু থেকে করোনা ক্যাম্পাস বন্ধ হওয়ার আগে পর্যন্ত মনে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে সবার। বন্ধুত্বের বন্ধন যে কতটা প্রকট করোনাকালীন তা অনুভব করছে সবাই। দীর্ঘদিন দেখা না হওয়ার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একে-অপরের খোঁজখবর নিচ্ছেন।
তবে ক্যাম্পাসের এই স্বাদ নেওয়ার সুযোগটি পায়নি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া নবীন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হতে না হতেই করোনা যেন তাদের থেকে সেই আনন্দটুকুই কেড়ে নিল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বন্ধুত্বটা কারো কাছে অনেক ভারী আর কারো কাছে ভরসার শব্দ। বন্ধু ছাড়া ক্যাম্পাস যেন মরুভূমি। প্রয়োজনে এরা অবতীর্ণ হয় মা, বাবা, ভাইয়ের ভূমিকায়। ক্যাম্পাসের বন্ধুদের মধ্যে থাকে আত্মার অভিন্নতা। বন্ধু ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কল্পনায়ও ভাবতেই পারে না অনেকে।]
