ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের শেষ কোথায়?

আপডেট : ১৬ মে ২০২১, ২১:৩৮

সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব যখন চরম আকার ধারণ করিয়াছে, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, আদৌ ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কোনো ফলপ্রসূ সমাধান নিকট ভবিষ্যতে পাইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে? জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুসারে ১৯৪৮ সালে যেই ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়, সেই একই প্রস্তাব অনুযায়ী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা পাইবার কথা ছিল; কিন্তু  ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করিয়া ইহুদি ও আরব দুইটি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করিবার জাতিসংঘের সেই প্রস্তাব ‘অসম এবং অন্যায্য’ এই দাবিতে আরবেরা মানিয়া লয় নাই। ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে বৃহত্তর অর্থে ইসরাইল-আরব সংঘাত হিসাবেও আখ্যায়িত করা যায়। জাতিসংঘের প্রস্তাবকে মানিয়া না লইয়া ১৯৪৮ সালে মিশর, সিরিয়া, জর্ডান ও ইরাক একযোগে ইসরাইলে আক্রমণ করিয়া বসে এবং সেই যুদ্ধে আরবেরা পরাজিত হইয়া বরং জাতিসংঘ কর্তৃক ইসরাইলের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গার চাইতেও অধিক জায়গা দখল করিবার পথ সুগম করিয়া দেয়। ইহার পর ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত আরো তিন বার আরব-ইসরাইল যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং প্রতিবারই পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থনে ইসরাইল যুদ্ধে জয়লাভ করে এবং ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করিতে সক্ষম হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটিলে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডটি ব্রিটেনের অধীনে চলিয়া যায়। ঐতিহাসিকভাবে এই ভূখণ্ডে আরবেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হইলেও ১৮৮২ সাল হইতে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে ঘাঁটি গাড়তে আরম্ভ করে। রোমানদের দ্বারা বিতাড়িত বিশ্ব জুড়িয়া ছড়াইয়া-ছিটাইয়া থাকা ইহুদি সম্প্রদায় ধর্মীয় ভাবধারার কারণে ফিলিস্তিনকে মনেপ্রাণে নিজেদের পুণ্যভূমি বলিয়া মনে করে। অন্যদিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আরবেরাও ফিলিস্তিনকে নিজেদের পূর্বপুরুষের ভূমি হিসাবে দাবি করিয়া আসিয়াছে। ১৯১৭ সালে বেলফোর ঘোষণার পর হইতে আনুষ্ঠানিকভাবে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করিতে শুরু করে। ইহার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন ব্রিটেনকে ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য ফিলিস্তিনে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব প্রদান করে, তখন হইতেই মূলত দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনার সূচনা ঘটে। ইসরাইল প্রতিষ্ঠা হইবার পর হইতে বিগত বত্সরগুলিতে আরব-ইসরাইল সহিংসতা কেবল বৃদ্ধিই পাইয়াছে, কোনো ফলপ্রসূ সমাধান সম্ভব হয় নাই। বরং এই সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাত কিংবা যুদ্ধের ফলে ফিলিস্তিনে আরবদের দুঃখ-দুর্দশাই কেবল বৃদ্ধি পাইয়াছে, রক্তাক্ত ধ্বংসস্তূপে গগনবিদারী আর্তনাদে বাতাস ভারী হইয়াছে আর ইসরাইলি আগ্রাসনে তাহাদের নিজেদের ভূমিও হাতছাড়া হইয়া যাইবার কারণে বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া নিজ বাসভূমে উদ্বাস্তুর ন্যায় জীবনযাপন করিতে হইতেছে। এইবার নূতন করিয়া ইসরাইল যেইভাবে আগ্রাসন শুরু করিয়াছে, তাহাতে ধারণা করা যায় ইসরাইলি সৈন্যবাহিনী গাজা, পশ্চিম তীর ইত্যাদি দখল করিয়া সাধারণ ফিলিস্তিন নাগরিকদের দরজার সম্মুখে উপস্থিত হইবে।

লক্ষ্যণীয় বিষয় হইল, বিগত প্রায় সাত দশকে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রটি তথ্যপ্রযুক্তি হইতে শুরু করিয়া সামরিক দিক হইতে বিশ্বের পরাশক্তি হইয়া উঠিয়াছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনে হামাস-ফাতাহ রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্ব স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে শক্তিশালী হইতে বাধাগ্রস্ত করিয়াছে। ইতিপূর্বে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন জানাইলেও সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলের সহিত বেশ কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের মিত্রতার ফলে সেই সমর্থনও ক্ষীণ হইয়া আসিবার সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হইলেও ইসরাইল কখনোই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে হাঁটে নাই। ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব, সংঘাত, যুদ্ধ যেন অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের ন্যায়, শেষ হইয়াও হইল না শেষ! ইসরাইল হয়তো তাহার সীমানা বৃদ্ধি করিতে পারিতেছে, আগ্রাসন চালাইতে পারিতেছে; কিন্তু যেই অস্থির ভূখণ্ডে তাহারা রাষ্ট্র গড়িয়া তুলিতে চাহিতেছে, সেইখানে উত্তেজনা জিয়াইয়া রাখিয়া শান্তির পথ পরিহার করিয়া তাহারাও কি কখনো শান্তিতে থাকিতে পারিবে?