মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতস্বরূপ যে সাতজন বীরকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়, মুন্সি আবদুর রউফ তাঁদের একজন। ১৯৪৩ সালের ৮ মে ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার সালামতপুর (বর্তমান নাম রউফ নগর) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তিনি বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেননি। সংসারের হাল ধরতে ১৯৬৩ সালের ৮ মে যোগ দেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে। সেসময় চাকরি পাওয়ার জন্য তাঁকে ৩ বছর বেশি বয়স দেখাতে হয়েছিল। চুয়াডাঙ্গার ইআরপি ক্যাম্প থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষ করে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে যান। ছয় মাস পরে তাঁকে কুমিল্লায় নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি-মহালছড়ি জলপথে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। রাঙামাটি-মহালছড়ি জলপথ দিয়ে পাকিস্তানি সশস্ত্রবাহিনীর চলাচল প্রতিরোধের দায়িত্ব পড়ে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ওপর। কোম্পানিটি বুড়িঘাট এলাকার চিংড়িখালের দুই পাড়ে অবস্থান নিয়ে গড়ে তোলে প্রতিরক্ষা ঘাঁটি।
৮ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীর দুই কোম্পানি সৈন্য মর্টার, মেশিনগান ও রাইফেল নিয়ে বুড়িঘাটের মুক্তিবাহিনীর নতুন প্রতিরক্ষা ঘাঁটিকে বিধ্বস্ত করতে সাতটি স্পিডবোট এবং দুটি লঞ্চ নিয়ে এগিয়ে আসতে থাকে। এটি ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের কোম্পানি। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ঘাঁটির কাছাকাছি পৌঁছেই পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ শুরু করে। স্পিডবোট থেকে মেশিনগানের গুলি আর লঞ্চ দুটি থেকে তিন ইঞ্চি মর্টারের শেল নিক্ষেপ করছিল মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে। অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর গোলাগুলির তীব্রতায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে যায় এবং তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করে ফেলে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে প্রতিরক্ষা ঘাঁটির কমান্ডার আবদুর রউফ বুঝতে পারলেন, এভাবে চলতে থাকলে ঘাঁটির সবাইকেই পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে মরতে হবে। তিনি তখন কৌশলগত কারণে পশ্চাত্পসারণের সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর সিদ্ধান্তে সৈন্যরা পিছু হটতে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনী তখন আরো এগিয়ে এসেছে, সবাই একযোগে পিছু হটতে থাকলে, একসঙ্গে সবাইকে মৃত্যুবরণ করতে হতে পারে ভেবে আবদুর রউফ পিছু হটলেন না। সহযোদ্ধাদের পিছু হটার সুযোগ করে দিতে নিজ পরিখায় দাঁড়িয়ে অনবরত গুলি করতে লাগলেন পাকিস্তানি স্পিডবোটগুলোকে লক্ষ্য করে। সাতটি স্পিডবোট একে একে ডুবিয়ে দিলে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দুটি লঞ্চ নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। লঞ্চ দুটো পিছু হটে রউফের মেশিনগানের গুলির আওতার বাইরে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেয়। পাকিস্তানি বাহিনী এরপর লঞ্চ থেকে মর্টারের গোলাবর্ষণ শুরু করে। মর্টারের গোলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা রউফের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। একটি মর্টারের গোলা তাঁর বাঙ্কারে এসে পড়ে এবং তিনি মারা যান। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর আগে সহযোগী যোদ্ধারা সবাই নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে যেতে পেরেছিল। সেদিন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রায় ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধার জীবন রক্ষা পায়।
২০১৪-এ পিলখানায় বাংলাদেশ রাইফেলস কলেজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ পাবলিক কলেজ। বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের স্মরণে শালবাগান, চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়ক, সাপছড়ির মধ্যবর্তী স্থানে ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন ব্যাটালিয়ন একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছে। মানিকছড়ি, মুসলিম পাড়া, মহালছড়ি, খাগড়াছড়ির একটি করে উচ্চ বিদ্যালয় তাঁর নামে রাখা হয়েছে। সিলেটের একটি ক্রিকেট স্টেডিয়াম তাঁর নামে। ফরিদপুর জেলাতেও তাঁর নামে রয়েছে একটি কলেজ।
