করোনা মহামারির দুঃসময়েও এই দেশে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের একশ্রেণির নেতাকর্মী ব্যক্তিস্বার্থের নেশায় মত্ত। তাহাদের বেয়াড়া ও বেপরোয়া আচরণ নানা প্রশ্নের জন্ম দিতেছে। সামান্য দ্বন্দ্ব, তর্কবিতর্ক বা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করিয়া তাহারা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়াইয়া পড়িতেছেন। এই সংঘাত-সংঘর্ষে নেতাকর্মীদের ঝরিতেছে রক্ত ও প্রাণ। গতকালের ইত্তেফাকের খবর অনুযায়ী পিরোজপুরে সদর উপজেলার কদমতলা ইউনিয়নে ক্ষমতাসীন দলের দুই গ্রুপের মধ্যে সহিংস ঘটনায় ইউপি চেয়ারম্যান, পুলিশ কর্মকর্তা ও দলের পাঁচ কর্মী গুরুতর আহত হইয়াছেন। এইখানে বোমা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটিয়াছে এবং হত্যার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হইয়াছে ধারালো অস্ত্র। মাদারীপুরের শিবচরেও দুই ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থীর বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিয়াছে—যাহাতে সাত জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হইয়াছেন অন্তত ১৫ জন। এই সকল আত্মঘাতী ও ভ্রাতৃঘাতী ঘটনা খুবই উদ্বেগ ও দুঃখজনক।
এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই বত্সরের মার্চ ও এপ্রিলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আধিপত্য বিস্তারের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কমপক্ষে ১১ জন নিহত ও দেড় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হইয়াছেন। আহতদের মধ্যে গুলিবদ্ধ হইয়াছেন অন্তত ৩০ জন। গত মাসেই খুন হইয়াছেন তিন জনেরও অধিক। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাটের বিভিন্ন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা দেশে বহুল আলোচিত ও সমালোচিত। গত বত্সরের মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর হইতে এপ্রিল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিবাদে আহত হইয়াছেন সহস্রাধিক মানুষ। হতাহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ এবং ইহার সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সংখ্যাই অধিক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, এই বত্সরের প্রথম তিন মাসেই আওয়ামী লীগ এবং ইহার সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলির মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহার মধ্যে ২০টি সংঘর্ষের ঘটনায় ছয় জন নিহত ও ৪০০ জন আহত হইয়াছেন। গত বত্সরে দেশে রাজনৈতিক সংঘাতে নিহত হইয়াছেন ৫২ জন। তাহার মধ্যে ৪০ জনই প্রাণ হারাইয়াছেন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে। ইহা ছাড়া বর্তমান সরকারের গত মেয়াদে পরিস্থিতি ছিল একই রকম উদ্বেগজনক। ২০১৬ সালে ৮৩ জন মারা যান এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে। এই সকল ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে ঘটিলেও ইহাতে সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হইতেছে। ইহা দুধের মধ্যে এক ফোঁটা চুন ঢালিয়া দেওয়ার মতোই ক্ষতিকর।
বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বাড়াবাড়ি অবশ্যই বন্ধ করিতে হইবে। যে কোনো উপায়েই হউক টানিয়া ধরিতে হইবে তাহাদের লাগাম। তাহাদের কারণে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তটস্থ। কিছু পাতিনেতার আচরণে জনগণ ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট। তাহাদের নিয়ন্ত্রণ করিতে না পারিলে সরকারের বিভিন্ন শুভ উদ্যোগ ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বৃথা যাইবে। এইরূপ আত্মঘাতী দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ বাড়িবার বহু কারণ রহিয়াছে। যাহারা দলে অনুপ্রবেশকারী তাহারা দলের আদর্শকে ধারণ না করিয়া নিজেদের ব্যবসায়-বাণিজ্য ও স্বার্থ উদ্ধারে অধিক ব্যস্ত। দ্বিতীয়ত দল এক যুগেরও অধিক সময় ধরিয়া ক্ষমতায় থাকায় এখন ‘কী পেলাম আর কী পেলাম না’ তাহাই মুখ্য হইয়া উঠিয়াছে। ইহাতে দ্বন্দ্ব বহুমুখী রূপ ধারণ করিতেছে। তৃতীয়ত শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাবে নিজেদের মধ্যেই প্রতিপক্ষমূলক মনোভাব বৃদ্ধি পাইয়াছে। তবে এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের পিছনে মোটাদাগে তিনটি কারণ রহিয়াছে। ১. জাতীয় বা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন লাভ। ২. আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে ঠিকাদারি ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ এবং ৩. দলের পদ-পদবি লাভ। এই সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাত সামলাইতে হইলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজরদারি বৃদ্ধি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থাগ্রহণ, দলীয় ঐক্য বজায় রাখিতে সাংগঠনিক সফর এবং প্রয়োজনে আপস-মীমাংসা-সমঝোতা ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
