মুক্তিযুদ্ধে শহিদ দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা

আপডেট : ১৭ মে ২০২১, ২১:৩৭

১৯৭১ সালে ৭ মে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে পুত্র, সঙ্গীসাথিসহ অপহূত হন। এরপর তাদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি। এ প্রসঙ্গ অবতারণার আগে রণদা প্রসাদ সাহার পরিচয় কিছুটা তুলে ধরা দরকার। কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা ১৮৯৬ সালে টাঙ্গাইল জেলার লৌহজং নদীঘেঁষা গ্রাম মির্জাপুরে এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে গ্রহণ করেন। ১৯১৫ সালে তিনি প্রথম মহাযুদ্ধে বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরে যোগ দেন। যুদ্ধক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘সোর্ড আব অনার’-এ ভূষিত হন। যুদ্ধ শেষে তিনি শুরু করেন ব্যবসায়। সীমাহীন পরিশ্রম, অসীম সাহস, ধৈর্য, নিষ্ঠা, সততা, সৈনিক জীবনের শৃঙ্খলা, প্রায়োগিক ক্ষমতা ও অতুলনীয় সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে রণদা প্রসাদ যৌবনেই শূন্য থেকে বিপুল বিত্তের মালিক হন। সেই সম্পদ আবার অত্যন্ত দক্ষতা ও দূরদর্শিতায় মায়ের নামে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে জাতি-ধর্মনির্বিশেষে মানবসেবায় উত্সর্গ করেন।

সম্পূর্ণ বিনা খরচে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য রণদা প্রসাদ তৈরি করেন সে সময়ে ঢাকা থেকে প্রায় যোগাযোগবিচ্ছিন্ন মির্জাপুরে কুমুদিনী হাসপাতাল, প্রথম আবাসিক বালিকা বিদ্যালয় ভারতেশ্বরী হোমস (১৯৩৮), মানিকগঞ্জে দেবেন্দ্র কলেজ (১৯৪২), টাঙ্গাইলে কুমুদিনী মহিলা আবাসিক ডিগ্রি কলেজ (১৯৪৩)। ১৯৪৪ সালে বাংলার গভর্নরের সাহায্যের আবেদনে সাড়া দিয়ে ব্রিটিশ রেডক্রসকে ২ লাখ ৫০ হাজার অর্থসাহায্য দেন। ট্রাস্টের উদ্যোগে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ম্যাটারনিটি বিভাগ স্থাপন করেন (১৯৫৮)। ১৯৪৭ সালে জুন মাসে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট আব বেঙ্গল প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবেই তিনি দেশের মানুষের সঙ্গে থেকে সবার জন্য কাজ করার এক মহান প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেন।

দেশ বিভাগের পর থেকেই রণদা প্রসাদ দেখেছেন অনেক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হানাহানি, হিংসা কিন্তু জন্মভূমি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা কখনো চিন্তাও করেননি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে যে টালবাহানা চলছিল তাতেই অনেকে শঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু তিনি তার সেবাধর্ম থেকে এক বিন্দু সরে দাঁড়াননি। ১৯৭১-এর ২৫শে মার্চ হানাদার পাকিস্তান বাহিনী শুরু করল তাদের অভিযান—বাঙালি নিধন। বাঙলিরাও বাধা দিল। প্রতিরোধ যুদ্ধ থেকে মুক্তিযুদ্ধ। এই  জনযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে গোটা জাতি। রণদা প্রসাদ সাহা যে এতে যোগ দেবেন সেটাই স্বাভাবিক। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় এগিয়ে এলেন। আজীবন আর্তের সেবায়, মানবতার জন্যই নিজেকে উত্সর্গ করেছিলেন। রণদা প্রসাদ জন্মভূমি ছেড়ে চলে যেতে চাইলে যেতে পারতেন ১৯৪৭ সালে, দেশ বিভাগের পরেই। সেখানেও তার সম্মান কিছু কম জুটত না। কিন্তু তিনি থেকে গেলেন মাটি কামড়ে, দেশের মানুষের সঙ্গে। ট্রাস্টের সঙ্গে জড়িত বহু মানুষকে মৃত্যুর মুখে ফেলে রেখে দেশত্যাগ তাঁর জন্য অকল্পনীয় ছিল।

জীবনকে বাজি রেখে এমনি এক কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি হানাদার বাহিনীর নজর এড়িয়ে সাহায্য করছিলেন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের। সাধারণ রোগীর ছদ্মবেশে আহত মুক্তিযোদ্ধারা কুমুদিনী হাসপাতালে পেত চিকিত্সা, ওষুধ, পথ্য ও অর্থ। গোপন ব্যাপারটি বেশি দিন গোপন থাকেনি। রাজাকার-আলবদরদের চেষ্টায় একদিন ফাঁস হয়ে যায় সব। যারা একদিন কুমুদিনী হাসপাতাল থেকে ওষুধ-পথ্য, চিকিত্সা পেয়েছিল বিনা মূল্যে, পেয়েছিল নতুন জীবন, তাদেরই একাংশ তার চরম শত্রু হয়ে দাঁড়াল।

একমাত্র পুত্র ভবানী প্রসাদ (রবি), পুত্রবধূ  শ্রীমতী সাহা ও তাদের ছেলে রাজীবসহ রণদা প্রসাদ থাকতেন কর্মস্থল নারায়ণগঞ্জে। সপ্তাহান্তে তারা মির্জাপুরে আসতেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তিনি সবইকে নিয়ে এলেন মির্জাপুর কুমুদিনী কমপ্লেক্সে, আশ্বাস দিলেন এখানে কোনো গোলমাল হবে না, কারণ এখানে ৮০০ বেডের বিশাল কুমুদিনী হাসপাতাল আছে।

রণদা প্রসাদ নারায়ণগঞ্জ-মির্জাপুর আসা-যাওয়ার মধ্যেই ছিলেন। রাজনীতির সঙ্গে তার কোনো সংস্রব ছিল না। কিন্তু সখ্য ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে। তিনি জানতেন তার শত্রু আছে। কিন্তু তার ভেতরের স্বচ্ছতাই তাকে সাহস জুগিয়েছে চিরকাল। ১৯৬৯ গণ-অভ্যুত্থানের বছর আইয়ুব সরকার রণদা প্রসাদকে ‘হেলাল এ পাকিস্তান’ খেতাবে ভূষিত করে। অভ্যুত্থান দমনের নামে মানুষ হত্যা আর বাংলার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সমর্থনে তিনি সেই খেতাব বর্জন করেন। শত্রুরা তার এই বীরোচিত পদক্ষেপকে পাকিস্তানবিরোধিতার নজির হিসেবেই বিবেচনায় নিল।

’৭১ এর ২৯ এপ্রিল, রণদা প্রসাদকে জেনারেল টিক্কা খান ঢাকায় গভর্নর হাউজে ডেকে পাঠায়। সেদিন তার গায়ে জ্বর ছিল এবং শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদেরকে ছেড়েও দেওয়া হয়েছিল। গভর্নর হাউজের গেটে আসতেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আর্মির একটি গাড়িতে জোর করে তুলে নেয় তাদেরকে।

 ৫ মে সকালে তাদেরকে মুক্তি দেওয়া হলো এবং আর্মির গাড়িতে করে নারায়ণগঞ্জ কুমুদিনী কমপ্লেক্সে পৌঁছে দেওয়া হয়। সকলেই ভাবলেন বিপদ কাটল হয়তো। কী আশ্চর্য, রণদা প্রসাদ তখনো কোথাও লুকিয়ে জীবন রক্ষা করার কথা ভাবেননি।

৭ মে, তখন মধ্যদুপুর। হিন্দু অধ্যুষিত গোটা মির্জাপুর গ্রাম ঘিরে ফেলে পাকিস্তান আর্মি, তাদের সঙ্গে মওলানা ওয়াদুদের স্থানীয় রাজাকার বাহিনী। বাড়িতে বাড়িতে আগুন, লুটতরাজ ও মানুষ হত্যার বর্বর উল্লাসে তারা মেতে ওঠে। একই দিনে নারায়ণগঞ্জে হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা রাত ১১.৩০ মিনিটে রনদা প্রসাদ সাহা, পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহা, সহকারী গৌরগোপাল সাহা, মতলব মিয়া ও একজন দারোয়ানকে  ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি।

রণদাপ্রসাদের বয়স তখন ৭৪ বছর, পুত্র রবি ২৭, সে তখন তিন বছর বয়সের এক পুত্রের জনক। রণদাকন্যা জয়া পতি তখন একমাত্র অভিভাবক। বাবা ও ভাইকে হারিয়ে শোকগ্রস্ত জয়া জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একই সঙ্গে পরিবার ও হাসপাতাল সামলেছেন। আর সেই জীবনযুদ্ধের সঙ্গে নিরন্তন খুঁজে গেছেন নিখোঁজ বাবা ও ভাইকে। মুক্তিযুদ্ধ সময় জুড়ে অত্যন্ত গোপনে ভারতেশ্বরী হোমসের আটকে পড়া ছাত্রী-শিক্ষকরা রান্না করা খাবার, গজ-ব্যন্ডেজ, উলের সোয়েটার তৈরি করে সাহায্য করে গেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের।

এই উপমাহীন আত্মদান, মানবতার যে অভ্রচূড়া শাশ্বত উচ্চশির তুলে রইল—রণদা প্রসাদ সাহা তো তারই অন্য নাম। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে মৃত্যুকে জয় করা রণদা প্রসাদ সাহা ও তার পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহা (রবি) বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

n লেখক :শিক্ষক, ভারতেশ্বরী হোমস