সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের জামিন আবেদনের ওপর আগামী রবিবার আদেশের জন্য দিন ধার্য করেছে আদালত। উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক বাকী বিল্লাহ গতকাল বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেন। ঐ দিন রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া রোজিনার বক্তব্যের একটি ভিডিও ক্লিপ উপস্থাপন করা হতে পারে। গতকাল শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা এই ভিডিও উপস্থাপনের জন্য আদালতের কাছে সময় প্রার্থনা করেন। এদিকে রোজিনার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে সাংবাদিকদের প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া অভিযোগ পেলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেছা বেগমের বিরুদ্ধে তদন্তের কথা জানিয়েছে দুদক।
গত মঙ্গলবার রিমান্ড আবেদন নাকচ করে রোজিনা ইসলামকে কারাগারে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে বৃহস্পতিবার শুনানির জন্য দিন ধার্য করে আদালত। গতকাল দুপুরে জামিন আবেদনের ওপর ভার্চুয়ালি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে রোজিনার আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ৩ ও ৫ ধারার কোনো উপাদান এই মামলার এজাহারে উল্লেখ নেই। ৩৭৯ ও ৪১১ ধারার উপাদান আনতে গেলে কী কী ডকুমেন্টস তিনি ‘চুরি’ করেছেন, তার বর্ণনাও এজাহারের কোথাও নেই। অতএব, এই এজাহার ত্রুটিপূর্ণ। দণ্ডবিধির ৪৯৬ ধারা অনুযায়ী জামিন পাওয়াটা তার প্রতি কোনো দয়া, অনুগ্রহ, অনুকম্পা নয়; বরং জামিন পাওয়াটা হচ্ছে তার মৌলিক অধিকার। করোনা ভাইরাসের সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি পরিস্থিতির শিকার। ফলে তার জামিন মঞ্জুর করা হোক। ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘রোজিনা ইসলাম অসুস্থ, সেজন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি তার জামিন বিবেচনা করার জন্য।’ এছাড়া আইনজীবী আমিনুল গনি টিটো, আশরাফ উল আলম ও প্রশান্ত কর্মকার শুনানি করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হেমায়েত উদ্দিন খান হিরণ বলেন, ‘মামলার এজাহারে রোজিনা ইসলামের নাম রয়েছে। আর যেসব ধারা আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে, এগুলো জামিন অযোগ্য। এই অভিযুক্ত নারী সাংবাদিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নথি চুরি করে সরকারকে বিব্রত করতে, বেকায়দায় ফেলতে চেয়েছেন। যে কারণে তার জামিন নামঞ্জুরের প্রার্থনা করছি। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। আমরা এই ভিডিও ক্লিপ আদালতে উপস্থাপন করতে চাইছি।’ উভয় পক্ষের শুনানি শেষে জামিন আবেদনের ওপর আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন বিচারক।
নিরপেক্ষ তদন্ত হবে :ডিবি
রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে করা অফিশিয়াল সিক্রেটস আইনে মামলার তদন্ত ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ’ হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল ডিবির রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার এইচ এম আজিমুল হক বলেন, এ মামলা নিয়ে তাদের ওপর কোনো ‘চাপ নেই’। মামলাটির সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সুন্দরভাবে তদন্ত হবে।
শিক্ষা উপমন্ত্রীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করল ডিআরইউ :রোজিনা ইসলামকে হেনস্তার আংশিক ভিডিও প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়ার কারণে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)। বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি ডিআরইউতে প্রবেশ করতে পারবেন না। গতকাল প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে এই ঘোষণা দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মসিউর রহমান খান।
সাংবাদিক নেতারা বলেন, শুধু রোজিনার মুক্তি নয়, মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি তাকে নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে ডিআরইউর সভাপতি মুরসালিন নোমানী বলেন, শুক্রবার সকাল ১০টায় ডিআরইউ প্রাঙ্গণে মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ সমাবেশ করা হবে।
ডিইউজের চার দফা :রোজিনা ইসলামের মুক্তিসহ চার দফা দাবি জানিয়েছে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে এ দাবি জানানো হয়। দাবির মধ্যে রয়েছে—১. নিঃশর্তে রোজিনার মুক্তি; ২. রোজিনাকে যারা হেনস্তা করেছে, তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা; ৩. ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের আইন আর প্রয়োগ যেন না হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে তার অঙ্গীকার করে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে এবং ৪. সাংবাদিক সুরক্ষা আইন করতে হবে।
সমাবেশে সিনিয়র সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, বিএফইউজের সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, বিএফইউজের সভাপতি মোল্লা জালাল, ডিইউজের সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপু, সাংবাদিক নেতা কাজী রফিক প্রমুখ বক্তব্য দেন। সমাবেশে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমাদের সহকর্মী রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে হেনস্তা হয়েছেন। আমরা অবিলম্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিচার চাই।’
অভিযোগ পেলে জেবুন্নেছার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা :দুদক
দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেছা বেগমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল দুদকের প্রধান কার্যালয়ে কমিশনার জহিরুল হক এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘এখানে এত বিঘা ও বিদেশে সম্পত্তি এটা বললে হবে না। জমি থাকলে কোন জায়গায়, টাকা কোন হিসাবে—এ রকম সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে আমরা খতিয়ে দেখব।’
