(৭ম পর্ব)
মোস্তফা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে দ্রুতবিচার আদালতের রায় ছিল হতাশার ও বিস্ময়ের। এ কথা আমি গতকালের লেখায় বলেছি এবং সেটির কারণগুলো বারবারই উল্লেখ করেছি। দেখার বিষয় ছিল, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের মহামান্য বিজ্ঞ বিচারপতিরা এই পুরো হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিকে ঠিক কীভাবে বিশ্লেষণ করেন। যে কোনো বিচারে বিজ্ঞ বিচারকের রায় শিরোধার্য হলেও সেটিতে একমত পোষণ না করলে একটা সুনির্দিষ্ট ধাপ পর্যন্ত সেই রায় বা সিদ্ধান্তের ওপর আপিল করা সম্ভব। এই বিচারের ক্ষেত্রেও সেটি হয়েছে।
আমি এই সিরিজটির সপ্তম পর্ব লিখছি আজ। আগামীকাল শেষ পর্ব ছাপা হবে। গত ছয়টি পর্বে এই হত্যা মামলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে আইনি বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছি, যেগুলো এই পুরো ঘটনার সঙ্গে কোনো-না-কোনোভাবে সম্পর্কিত। আজকের পর্বে আমার দেখবার বিষয় হচ্ছে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারকের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন ও অ্যাপিলেট ডিভিশন ঠিক কীভাবে এই পর্যবেক্ষণ করেছে।
হাইকোর্ট ডিভিশনের রায়ের ১০১ নম্বর পৃষ্ঠায় আদালত বলছে, A dying declaration is a substantive piece of evidence. It stands on the same putting as any other piece of evidence. It can be the sole basis of conviction if it is found credible.
পাঠক লক্ষ করে দেখুন, আদালত পরিষ্কারভাবে বলছে, যদি তা ‘ক্রেডিবল’ হয়। তার মানে দাঁড়ায়, এই মৃত্যুকালীন বিবৃতিটি হচ্ছে পুরো হত্যা মামলার ‘প্রাণভোমরা’, যেটিকে কেন্দ্র করে মহামান্য আদালত তাদের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। অথচ একটি ব্যাপার বারবারই আমার কাছে ছিল মহা আশ্চর্যের। সেটি হচ্ছে, এই মামলার বাদীর বক্তব্যের সঙ্গে মৃত্যুকালীন বিবৃতির এতটা ফারাক থাকার পরেও সেটিকে অনেকটা ক্ষুদ্র একটা ব্যাপার বলে দেখছেন বিজ্ঞ বিচারকেরা। আর কেন তারা এভাবে দেখছেন, সেটির কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যাও আমরা লক্ষ করি না, অন্তত প্রথম দুটি আদালতে। হাইকোর্ট ডিভিশনের রায়ের ১০৫ পৃষ্ঠায় আদালত কিন্তু পরিষ্কারভাবে বলছে যে মৃত্যুকালীন বিবৃতির ক্ষেত্রে ‘সাম ডিগ্রি অব কশন’-এর কথা (শামসু ভার্সেস রাষ্ট্র, ৪২ ডিএলআর)। কিন্তু আদালত কি ‘সাম ডিগ্রি অব কশন’ তত্ত্বকে আদৌ এর যথাযথ প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্লেষণ করেছে? অন্তত আমার পর্যবেক্ষণ বলে, না, মৃত্যুকালীন বিবৃতির পুরো বিষয়টা যে সতর্কতা আর ‘থ্রেশহোল্ড’/ ছাঁকুনি’র মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা, সেটি বোধকরি যায়নি। কিন্তু আমি যে কথা বারবার প্রথম থেকেই বলে আসছি, এই মামলার ক্ষেত্রে সেটিকে খুঁজে পাওয়া যায় অ্যাপিলেট ডিভিশনের রায়ে।
অ্যাপিলেট ডিভিশন তার রায়ের ১২ নম্বর পৃষ্ঠায় একেবারে পরিষ্কার করে বলেছে যে, A close look at the dying declaration will reveal that it was recorded in such a manner if the maker was a normal person. Who suffered no disease or sustained any injury. It was neatly worded. At one stage the victim stated that ‘মাসুম পয়েন্ট ৫ পিস্তল দিয়া আমার পায়ে গুলি করে’ he was narrating the incident so meticulously as if he was a normal man. It was not at all practicable for a dying man to narrate the description of the pistol by which masum shot at him. The use of the language, the words, coma, full stop are so neatly structured raises some amount of doubt as to the authenticity of the entire statement. অ্যাপিলেট ডিভিশনের এই বক্তব্য আমি বারবার করে বলেছি আমার আগের পর্বে যে মোস্তফা ঠিক যেভাবে তার মৃত্যুকালীন বিবৃতি দিয়েছেন, এটা ৯টা গুলিতে আহত মুমূর্ষু ব্যক্তির ক্ষেত্রে হতে পারা অসম্ভব একটা ব্যাপার। বিজ্ঞ অ্যাপিলেট ডিভিশনের বিচারপতি সরাসরি ধরে ফেলেছেন এই বিবৃতিকে এবং তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। নিহত মোস্তফার মৃত্যুকালীন বিবৃতি প্রশ্নে যে ‘সাম ডিগ্রি অব কশন’-এর কথা হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, সেগুলোর একটি ধাপও কি আমরা এই বিচারের কোনো ধাপে দেখেছি? মোস্তফার মানসিক সুস্থতার কোনো রিপোর্ট দেখা যায়নি বিচারের একটি ক্ষেত্রেও। তার স্ত্রী যে কথা এজাহারে বলেছেন, মানে কারা কারা তাকে আহত করেছেন, সে কথার সঙ্গে মৃত্যুকালীন বিবৃতির পরিষ্কার পার্থক্য থাকলেও দ্রুত বিচার আদালত তো এটিকে ‘সামান্য গরমিল’ বলেই ধরে নিয়েছেন, যেটার একই অনুরণন আমরা পাই হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের ১২০ নম্বর পৃষ্ঠায়, যেখানে আদালত এই গরমিলকে ‘some discrepancies’ বলে উল্লেখ করেছেন। বাদী বলছে, পেটে ও বুকে গুলি করেছেন মাসুদ নামের এক ব্যক্তি, আবার নিহত ব্যক্তি মাসুদ নামের কারো নামই বলেননি। আবার নিহিত ব্যক্তি বলছেন পরে জোসেফ গুলি করেছেন পেটে ও বুকে, এই পুরো ৩৬০ ডিগ্রি বক্তব্য যদি ‘সামান্য গরমিল’ অথবা ‘সাম ডিস্ক্রেপেন্সি’ বলে মহামান্য বিচারকেরা মনে করেন, সেই ক্ষেত্রে আমার হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছুই বাকি থাকে না।
(আগামীকাল সমাপ্য)
লেখক: আইনজীবী
ইত্তেফাক/কেকে
