বিজ্ঞানীদের নিগ্রহ

আপডেট : ২১ মে ২০২১, ১৯:১৩

মাধব রায়

সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)

ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট

আজকে অফিস থেকে ফিরে নীলকান্তবাবু আরও খারাপ খবর দিলেন। করোনা নামক ভাইরাসটি চিন দেশকে ছেয়ে ফেলেছে। আগেই লকডাউন দেয়া হয়েছিল। লোকজন ঘর থেকে বের হবে না। সবাইকে অবশ্য খাবার দাবার সরবরাহ করছে সে দেশের সরকার। বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রী সেখানে আটকা পড়েছে। তারা না পারছে আসতে, না পারছে বের হতে।

তাহলে তো এরা খুব বিপদের মধ্যে আছে, বললেন কমলা।

বিপদ মানে, মারাত্মক বিপদ। একে তো বিদেশ বিভুই, মা-বাবা নেই কাছে, নেই আত্মীয়-স্বজন, এর মধ্যে এরকম একটা পরিস্থিতি, ভয়াবহ অবস্থা। এর ওপর আবার আশেপাশের কয়েকটি দেশে ছড়িয়েছে এই ভাইরাস। বিমানবন্দরে খুব কড়াকড়ি। বিভিন্ন দেশ বিমান যোগাযোগ বন্ধ করেছে চিনের সাথে।

এই অবস্থা যত তাড়াতাড়ি দূর হয়, ততোই মঙ্গল। বললেন কমলা।

নীলকান্তবাবু ফ্রেশ হয়ে সবাইকে নিয়ে বসলেন। আজকে কী গল্প শুনবে?

গতদিন গ্যালিলিওর আবিষ্কারের কথা শুনে সবাই খুশি হয়েছিল, কিন্তু তার নিগৃহীত হবার কথা সবাইকে পীড়া দিয়েছে। আকাশ বলল-আর কোনও বিজ্ঞানীকে কি তার আবিষ্কারের জন্য নিগৃহীত হতে হয়েছে?

অনেক, বললেন নীলকান্তবাবু। বিজ্ঞানের আবিষ্কার সাধারণ সরল পথে হয়নি। যুগে যুগে প্রথার বিপরীতে আবিষ্কারককে লাঞ্চনা গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে। এই যে এখন এতবড় একটা রোগ মহামারি আকারে দেখা দিচ্ছে, এতসব লোকের মৃত্যুর কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে...

কমলা বললেন-এরকম মহামারি তো প্রত্যেক শতাব্দীতে একবার করে দেখা দিচ্ছে, হয়তো স্প্যানিশ ফ্লু, অথবা কলেরা, অথবা প্ল্যাগ, প্রত্যেকবারে বিপুল সংখ্যক লোক মৃত্যুবরণ করেছে।

নীলকান্তবাবু বললেন, হ্যাঁ, আগের মানুষ কী ভাবত জানো? আগের মানুষ বিশ্বাস করত অসুস্থতা কোনও পাপের ফল বা অশুভ শক্তির ইচ্ছা। সুইজারল্যান্ডের বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন ও ভেষজবিদ্যার অধ্যাপক ডাক্তার ফিলিপ্রাস অ্যাউরেওলাস প্যারাসেলসাস ১৫২৭ সালে বললেন, মানুষের অসুস্থতা কোনও পাপ বা অশুভ শক্তির ইচ্ছায় নয়। এক ধরনের জীবাণুর আক্রমণে মানুষ অসুস্থ হয়। এই পরজীবী জীবাণুদের ধ্বংস করতে পারলেই মানুষের অসুস্থতা দূর হবে। এই বক্তব্য ধর্মপ্রচারকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হলো না। তাঁরা বললেন-ধর্ম আমাদেরকে যুগযুগ ধরে যা বলে এসেছে তা-কি একজন উন্মাদ অধ্যাপকের কথায় মিথ্যে হয়ে যাবে? শতাব্দীর পর শতাব্দী পবিত্র ধর্মগুরুরা যা বলে গেছেন তা কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাস করে আসছে, তার সবই কি মিথ্যা?

ধর্মবিরোধি মতবাদ প্রচারের মিথ্যা অপরাধে প্যারাসেলসাসকে বিচারের মুখোমুখি করা হলো। মনগড়া সেই বিচারে শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড। জন্মভূমি ছেড়ে পালিয়ে বেঁচেছিলেন তিনি।

মানুষ কত বোকা ছিল। বলল রেখা।

নীলকান্তবাবু বললেন-সপ্তদশ শতাব্দীর অনেকদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা শূন্যস্থান সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। ঈশ্বর সর্বশক্তি প্রয়োগ করে শূন্যতাকে ভরে রাখেন-ছিল তাঁদের ধারণা। জার্মানির হামবুর্গ এর পৌরকর্তা, পদার্থবিজ্ঞানী এবং কূটনীতিবিদ অটোভন গেরিক বিজ্ঞানীদের এই ধারণা ভাংতে সচেষ্ট হন। তিনি শূন্যস্থান রয়েছে বলে প্রচার করতে থাকেন। গির্জা থেকে তাঁকে সাবধান করে দেয়া হয়, যাতে এরকম ধর্মবিরোধি কথা তিনি না বলেন। কিন্তু তবুও বায়ুনিষ্কাশন যন্ত্র আবিষ্কার করে গেরিক দেখালেন, কোনও আবদ্ধ স্থান থেকে বাতাস পুরোপুরি বের করে দিয়ে ঐ স্থানটিকে একেবারে শূন্য বানানো সম্ভব। ১৬৫৪ সালে রেগেনসবুর্ক-এর লোকসভায় বায়ুশূন্য স্থান সৃষ্টি করে দেখালেন তিনি।

কীভাবে শূন্যস্থান সৃষ্টি করলেন? সীমা জানতে চায়।

গেরিক চারমিটার ব্যাসবিশিষ্ট দুটো অর্ধগোলক এমনভাবে তৈরি করলেন, যাতে একটা আরেকটার সাথে খাপে খাপ মিলে যায়। নিজের আবিষকৃত বায়ুনিষ্কাশন যন্ত্র দিয়ে গোলকের ভেতরের বাতাস বের করে দিলেন। তারপর বায়ুশূন্য অর্ধগোলক দুটির দুইদিকে আটটা করে মোট ষোলটা ঘোড়া বেঁধে দিয়ে বিপরীত দিকে টানতে লাগলেন। টানের জোরে রশি ছিঁড়ে গেল, গোলকগুলি কিন্তু খুলল না। এরপর একটা ছিপি খুলে দিয়ে হালকা টান দিতেই হুস করে খুলে গেল। গেরিক বললেন, গোলকের ভিতরে শূন্যস্থান সৃষ্টি হওয়ায় বাইরের দিক থেকে বায়ু প্রচণ্ড চাপ দিয়ে আটকে রেখেছে। ফলে ষোলটি ঘোড়াও এটি খুলতে পারে নাই।

কিন্তু গেরিকের তত্কালীন প্রতিদ্বন্দ্বী বিজ্ঞানীরা এর বিরোধিতা করতে থাকেন। লোকজনকে বলতে থাকেন, গেরিক যা দেখিয়েছেন, তা একটা আকষ্মিক ঘটনা। হঠাত্ কেমন যেন আটকে গিয়েছিল। নইলে গোলক দুটি এমনিতেই খুলত।

পরবর্তীকালে গেরিক দেখালেন, শূন্যস্থানে আগুন জ্বলে না এবং শব্দও শোনা যায় না। কিন্তু এটিও তাঁরা মানতে চায়নি। এই আবিষ্কারের সংবাদ যাতে প্রচার না হয়, সেই ব্যবস্থা করলেন। যে শূন্যস্থান ঈশ্বর পছন্দ করেন না, তা তাঁরা কীভাবে প্রচার করবেন।

ভয়ংকর অবস্থা, বলল চন্দ্রা।

১৮১৪ সালে জর্জ স্টিভেনসন বাষ্পচালিত ইঞ্জিন তৈরি করলেন। এই যন্ত্র কিলিংওয়র্থ কয়লা খনিতে ব্যবহূত হলো। কিন্তু তিনি যখন ইংল্যান্ডের লোকসভায় লিভারপুল ম্যানচেস্টার রেল লাইন পাতার প্রস্তাব করেন, তখন এমপিদের ব্যঙ্গবিদ্রুপ আর চিত্কারে তাঁকে বসে পড়তে হলো।

কী বললেন তাঁরা?

তাঁরা বললেন-রেল লাইন পাতা হলে ইঞ্জিনের শব্দে মানুষ ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাবে। ইঞ্জিনগুলো মানুষের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেবে। লাইন বরাবর জমির দাম পড়ে যাবে।

তবে রাজনীতিবিদগণ নিজেরাই অবশ্য নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। লিভারপুল ম্যানচেস্টার রেললাইন বিল পাশ হলো ১৮২১ সালে। সাতবছর পর।

চন্দ্রা বলল, তাহলে ইংল্যান্ডের এমপিরাও আমাদের এমপিদের মতোই ছিল!

সবাই হেসে ফেলল।       পরের অংশ আগামীকাল