মোস্তফা হত্যা মামলা

জোসেফ, হারিস ও আনিস কি সুবিচার পেয়েছিলেন?

আপডেট : ২২ মে ২০২১, ০৩:০৬

যদিও আপিলেট ডিভিশন শেষ পর্যন্ত এই মৃত্যুকালীন বিবৃতিকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন এবং একজন আহত ব্যক্তি যে এত অবলীলায় গল্প আর পিস্তল কোন ঘরানার, এমন গল্প আওড়াতে পারেন না (যেখানে ভিক্টিম একজন ব্যবসায়ী, অস্ত্র কারবারি নন)—এই কথা গত পর্বে উল্লেখ করেছি। এই মৃত্যুকালীন বিবৃতির ক্ষেত্রে আপিলেট ডিভিশন আব্দুল রাজ্জাক ভার্সেস রাষ্ট্র (১৭ ডিএলআর) এবং তায়েব খান ভার্সেস রাষ্ট্র (২২ ডিএলআর) এই দুটি মামলারও নজির টানেন।

আদালত স্পষ্টভাবে মোস্তফার এই মৃত্যুকালীন বিবৃতিকে খারিজ করে দেয়। আপিলেট ডিভিশন হাইকোর্ট বিভাগের করা সমালোচনা করে বলে—The High Court division has totally overlooked this aspect of the matter and believed the dying declaration in Toto without application of its judicial mind.’

আপিলেট ডিভিশন আরো বলে—But the High Court Division ought to have considered the non-disclosure of the appellant Kabil’s name at the initial stage and the disclosure after 8 days of the occurrence itself is a good ground to disbelieve it so far the appellant is concerned particularly when there is admitted enmity between the parties.

হাইকোর্ট বিভাগের করা সমালোচনা করে এই রায়ের ২২ পৃষ্ঠায় আদালত বলে, High Court division has committed another illegality in believing his complicity while disbelieving the involvement of masum.

আপিলেট ডিভিশনের রায়ে একটি বক্তব্যে এটি পরিষ্কার হয় যে (পৃষ্ঠা ২৩) নিহত মোস্তফার সঙ্গে এই মামলায় অভিযুক্ত তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক সমস্যা ছিল এবং আমি আমার আগের পর্বের উল্লেখ করেছি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়েই এই মামলায় তোফায়েল আহমেদ, হারিস আহমেদ ও আনিস আহমেদকে জড়ানো হয়েছিল। কিন্তু পূর্ববর্তী রায়গুলোতে এই রাজনৈতিক জিঘাংসার বিষয়টি বলা যায় অনুল্লিখিতই ছিল কিন্তু আপিলেট ডিভিশন সেটি উল্লেখ করেছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, নিহত মোস্তফার শরীরে যে ইনজুরি। গুলির চিহ্ন/আলামত পাওয়া গেছে সেটিকে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী সেপ্টিসেমিয়া শক (গুলির আঘাতের কারণে) বলে উল্লেখ করলেও তিনি সুনির্দিষ্টভাবে বলেন নাই, ঠিক কোন ইনজুরি বা আঘাতে নিহতের মৃত্যু হয়েছে (আপিলেট ডিভিশন রায়, পৃষ্ঠা ২৪)।

আপিলেট ডিভিশন এটিও উল্লেখ করেছে যে তারা এটা মনে করে না যে—‘this positive opinion of the expert leads us to believe that the death of the deceased was not primarily due to the injuries caused by the accused persons.’ আরো বিস্তারিতভাবে আপিলেট বিভাগ রায়ের ২৬ পৃষ্ঠায় বলে যে—‘applicant is not alone responsible for the cause of death’—মানে দাঁড়ায় মোস্তফার মৃত্যুর প্রাথমিক কারণ কোনোভাবেই অভিযুক্তের কারণে নয়। এখানে একটি ব্যাপার বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে আপিলেট ডিভিশনে অভিযুক্তের আইনজীবী ‘অন মেরিটে’ আদালতে যুক্তি-তর্কে অবতীর্ণ হন নাই; সুতরাং আইনজীবী যখন এই বিষয়ে যুক্তি না দেন, একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে আমার বলার স্থান তেমন একটা থাকে না। তবে আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, এখানে অভিযুক্ত জোসেফ, হারিস ও আনিস আহমেদের বিরুদ্ধে এই মামলা ছিল অত্যন্ত দুর্বল এবং এই মামলায় যথেষ্ট সুযোগ ছিল অভিযুক্তদের নির্দোষ প্রমাণের ক্ষেত্রে। যেই মামলায় বাদী নিজে মাসুদ নামের একজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে বলেন যে তিনি মোস্তফাকে পেটে ও বুকে গুলি করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে সেই মাসুদকে আদালত মুক্তি দিতে পারে, সেখানে জোসেফ যার অপরাধ হিসেবে বলা হচ্ছে হাঁটুতে ও পায়ের গোড়ালিতে গুলি করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে যেখানে খোদ আপিলেট ডিভিশন মৃত্যুকালীন বিবৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেটিকে তীব্রভাবে বিদ্ধ করেছেন, সেখানে এই মামলায় অভিযুক্ত তোফায়েল আহমেদ জোসেফ, হারিস ও আনিসও খালাস পেতে পারতেন বলে আমি অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে এবং বিনয়ের সঙ্গে মনে করি।

মোস্তফার হত্যা মামলা নিয়ে এই দীর্ঘ লেখার উপসংহারে আমি বলব যে এই মামলার একেবারে শুরু থেকে এজাহার, তদন্ত, সাক্ষীদের জবানবন্দি রেকর্ড, বিশেষ করে মৃত্যুকালীন বিবৃতি ধারণের ক্ষেত্রে অনেক রকমের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জিঘাংসা লক্ষণীয়। বিশেষ করে অভিযুক্তের সঙ্গে এবং তার দুই ভাইয়ের সঙ্গে অভিযুক্তের রাজনৈতিক দ্বৈরথ, তত্কালীন সাংসদ হাজি মকবুল ইসলামের নানাবিধ কূটচাল, তার নীতিহীন রাজনীতি এমন অসংখ্য বিষয় এই মামলার ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে আমরা অস্তিত্বহীন ব্যক্তিদেরও এই মামলার আসামি হতে দেখেছি। এমনকি একজন মানুষ এতগুলো গুলিতে ইনজুরড হয়ে সাধারণ মানুষের মতো যেভাবে হাসতে আর খেলতে মৃত্যুকালীন বিবৃতি দিয়েছেন তাও মিথ্যে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমাণিত হয়েছে আপিলেট ডিভিশনে। এত কিছুর পরেও এই মামলায় তোফায়েল আহমেদ খালাস পাননি, এটা আমার জন্য হতাশার ছিল কিন্তু দিনের শেষে মহামান্য আদালতের সিদ্ধান্তই আমাদের সকলের জন্য শিরোধার্য।

তবে কিছু নিরীহ ব্যক্তি অন্ততপক্ষে ফাঁসির দুয়ার থেকে মুক্ত হয়েছেন এবং এই মিথ্যা মামলায় তাদের জীবন অবসান হয়নি, হয়তো শেষ পর্যন্ত এটাই আশার কথা। তবে যে প্রশ্নটি আমি বারবার করেছি এই লেখায় যে এই মোস্তফা হত্যা মামলায় কি অভিযুক্ত জোসেফ-হারিস ও আনিস আহমেদ সুবিচার পেয়েছেন? এই প্রশ্নের উত্তরে আমি এখনো মনে করি—না, তারা সুবিচার পান নাই, তবে আদালত তার সামনে প্রমাণপত্র, নথি যা পেয়েছে কিংবা এসেছে সে হিসাব নিয়েই তারা বিচার করেছেন। বুকের ভেতরে নানাবিধ হতাশা নিয়ে, অপ্রাপ্তি আর কষ্ট নিয়ে আদালতের রায়কেই মেনে নিতে হবে। (সমাপ্ত)

লেখক: আইনজীবী

ইত্তেফাক/জেডএইচডি