নতুন আতঙ্ক ব্ল্যাক ফাঙ্গাস

আপডেট : ২৪ মে ২০২১, ২১:৩০

করোনা থেকে সেরে ওঠার পরও মানুষের মধ্যে স্বস্তি নেই। করোনার পর এখন নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস। মূলত কোভিড থেকে আরোগ্যলাভের পর শরীরে বিরল যে সংক্রমণ হয়, তার নাম ব্ল্যাক ফাঙ্গাস। এর বৈজ্ঞানিক নাম হলো মিউকোরমাইসিস, যা খুবই বিরল একটি সংক্রমণ।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস একধরনের ছত্রাক সৃষ্ট রোগ। রোগটি মূলত বায়ুবাহিত। বাতাসে ছত্রাকের বীজগুটি বা স্পোর ভেসে বেড়ায়। শ্বাসগ্রহণের সময় সাইনাস ও ফুসফুসে জীবাণু প্রবেশ করে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের কারণে সাইনাস ও ফুসফুস সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। মিউকর নামে একটি ছত্রাকের সংস্পর্শে এলে মূলত এই সংক্রমণ হয়। মাটি বা জৈব সারের মতো স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে এই ছত্রাক তৈরি হয়। এই ছত্রাক সাধারণত পাওয়া যায় মাটি, গাছপালা, সার এবং পচন ধরা ফল ও শাকসবজির মধ্যে। এই ছত্রাক সাইনাস, মস্তিষ্ক ও ফুসফুসকে আক্রান্ত করে থাকে। যাদের ডায়বেটিস, ক্যানসার, এইচআইভি এইডস রয়েছে কিংবা করোনার কারণে যাদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে গেছে, তাদের এই মিউকর থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ডিজেজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেন্স (সিডিসি)-এর তথ্যমতে, নানা ধরনের ছত্রাক মূলত এই সংক্রমণের জন্ম দেয়। তবে এই ছত্রাক অনেক মানুষের ক্ষেত্রে ততটা ক্ষতিকর নয়। রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কম এমন মানুষের ক্ষেত্রে এই ছত্রাকের সংক্রমণ বেশ গুরুতর এবং অনেক সময় মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোগের জীবাণু বাতাসের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। অন্যদিকে কাটাছেঁড়া বা পোড়া ত্বকে এই ভাইরাসের দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে শরীরের কোথায় এই ছত্রাক বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে মূলত বিভিন্ন লক্ষণ প্রকাশ পায়। এই জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে মুখ ফুলে ওঠা, জ্বর, ত্বকে আলসার, মুখে কালো ক্ষত প্রভৃতি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমাদের শরীরের কপাল, নাক, গালের হাড় ও দাঁতের পেছনে এই রোগের সংক্রমণ প্রথমে প্রকাশ পেতে শুরু করে। পরে এটি চোখ, ফুসফুস ও মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে। নতুন এই রোগের কারণে নাকের ওপরের ত্বক কালো বা বিবর্ণ হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া, চোখে ঝাঁপসা দেখা বা কোনো জিনিস একের অধিক দেখা যেতে পারে। তাছাড়া এই সংক্রমণের কারণে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং কাশির সঙ্গে রক্তপাত হতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত স্থানে কালো দাগ তৈরি হয়। আক্রান্তদের নাক থেকে শ্লেষ্মামিশ্রিত কালো শক্ত পদার্থ বের হয়। অন্যদিকে পরিপাকতন্ত্রে সংক্রমণ হলে পেটে ব্যথা ও বমি হয়। করোনায় আক্রান্ত রোগীর চিকিত্সায় স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয়। ফলে করোনা থেকে সেরে ওঠার পর ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধের ব্যবহারে অতি সতর্ক হতে হবে। যাদের ক্যানসার, ডায়বেটিস, কিডনি ও হার্টের রোগ রয়েছে, তারা যদি করোনায় আক্রান্ত হন, তাহলে তাদের ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে গত কয়েক সপ্তাহ যাবত্ প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মানুষের শরীরে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে এই ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হয়ে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সম্প্রতি ভারতের রাজ্য সরকার একে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস শনাক্তের এখনো পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে যেখানে ভারতীয় ধরন চলে এসেছে, সেখানে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস আসতে খুব বেশি সময় লাগবে না বলে অনেকেই মনে করছেন। তাই ভারতের অবস্থা বিবেচনা করে আমাদের সাবধান হতে হবে। দেশে সম্প্রতি করোনার ভারতীয় ধরনের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। এমতাবস্থায় ভারতীয় ব্ল্যাক ফাঙ্গাসও যদি দেশে প্রবেশ করে, তবে তা হবে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। কাজেই মানুষের জীবন তথা রাষ্ট্রের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়