পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে গতকাল সোমবার সকাল ৬টায় গভীর নিম্নচাপটি উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে ভয়াল সুপার সাইক্লোন ‘ইয়াস’-এ পরিণত হয়। অতঃপর এই ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয় করে ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের দিকে ধেয়ে আসে। আবহাওয়াবিদ আরিফ হোসেন বলেন, ইয়াস কিছুটা গতিপথ পরিবর্তন করায় এখন বাংলাদেশের দিকে না এসে ভারতের ওড়িশার দিকে যাচ্ছে। তবে যে কোনো সময় এই ঝড়ের গতিপথে আবারও পরিবর্তন ঘটতে পারে। আজ মঙ্গলবার দিনগত মধ্যরাত থেকে ইয়াসের প্রভাব পড়তে শুরু করবে উপকূলীয় জেলাগুলোতে। গতিপথ বদলে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও বরগুনা জেলা লন্ডভন্ড হয়ে যাবে। আর না এলেও ইয়াসের প্রভাবে আগামীকাল বুধবার পূর্ণিমার ভরা কোটালে উচ্চ জলোচ্ছ্বাস ও তুমুল ঝোড়ো বৃষ্টিপাতের কবলে পড়বে এই চার জেলা। গত বছরের সুপার সাইক্লোন আম্ফান, তার আগে আইলা কিংবা সিডরের ঘূর্ণিঝড় গতিমুখ পরিবর্তন করেই উপকূলে আঘাত হানে। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের ৩০ বছর পর আবারও ভরা পূর্ণিমায় ঘূর্ণিঝড় আসছে সমান ভীতি নিয়ে।
এদিকে গুমোট গরমে ওষ্ঠাগত নগরজীবন। গরমে ঘুম নেই সাধারণ মানুষের। এখন একমাত্র ভরসা বঙ্গোপসাগরে থাকা ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। টানা কয়েক দিনের তাপপ্রবাহের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় অসহনীয় গরম অনুভূত হচ্ছে রাজধানীসহ সারা দেশে। আবহাওয়া অফিস বলছে, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বৃষ্টি শুরু হলে মঙ্গলবার থেকে গরমের তীব্রত ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। জ্যৈষ্ঠের প্রথম সপ্তাহ থেকে টানা কয়েক দিন ধরে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। এরই মধ্যে সাগরে লঘুচাপ সৃষ্টির পর গরমের তীব্রতা বেড়েছে শনিবার থেকে। আবার অধিকাংশ জায়গায় মেঘলা আবহাওয়ায় ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে।
ভারতের আবহাওয়া অফিস (আইএমডি) ও সাইক্লোন সেন্টার ইয়াসের বর্তমান গতিমুখ বিশ্লেষণ করে বলছে, ২৬ মে সকালের দিকে এটি ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের কাছে চলে আসবে। আর দুপুরের দিকে ওড়িশার প্যারাদ্বীপ ও পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপের মধ্যভাগ দিয়ে বালাসোরের কাছে কোনো এলাকা দিয়ে স্থলভাগে উঠে আসবে। উপকূলে আঘাত হানার পর ঘূর্ণিঝড়টি টানা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা তাণ্ডব চালাতে পারে। সে সময় বাতাসের গতি ঘণ্টায় গড়ে ১৮০ থেকে ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানান, সরাসরি ওড়িশার দিকে ইয়াসের গতিপথ। যদি এই গতিপথ একই রকম থাকে, তবে বাংলাদেশ উপকূলে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে আমরা আশা করছি। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে হয়তো মেঘ ও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। তবে ‘ইয়াস’-এর ভয়াবহতা থেকে উপকূলের মানুষের জানমাল রক্ষায় প্রস্তুতি শুরু করেছে প্রশাসন। এ লক্ষ্যে উপকূলবর্তী জেলাগুলোতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে সাইক্লোন শেল্টার। জোয়ার-জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে উপকূলভাগের কাঁচা বাড়িঘর, মাছের ঘের, চাষের জমি ও খেতখামারের ক্ষতি রোধ করতে এখনই স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাঁধ মেরামত চলছে। সাগরে প্রবল ঢেউ ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করায় ইতিমধ্যে মাছ ধরার শতাধিক ট্রলার উপকূলে ফিরেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সর্বশেষ বুলেটিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। ডা. এনামুর রহমান বলেন, ঝড় ঘুরে ওড়িশার দিকে ধাবিত হওয়ায় আপাতত সংকেত বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। সবকিছু কঠিন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উপকূল থেকে না সরে আসা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে রাখব। স্বেচ্ছাসেবক ও মাঠ প্রশাসন সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে। বিপত্সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন তারা আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
