দুই ভাইয়ের ‘ভালোবাসার ডিব্বা’

আপডেট : ২৫ মে ২০২১, ২১:০০

>> গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত

 

দুই ভাই মিলে একসঙ্গে সমাজের মানুষের জন্য কাজ করছে বেশ কয়েক বছর ধরে। গত এপ্রিল মাসে তারা শুরু করেন নতুন উদ্যোগ ‘ভালোবাসার ডিব্বা’। এই দুই ভাই হলেন মাহিন আব্দুল্লাহ এবং আব্দুল্লাহ আল মোরশেদ। বাবা এম এ রাজ্জাক একজন মুক্তিযোদ্ধা। মাহিন আব্দুল্লাহ একজন সমাজসেবক এবং মোরশেদ মিশু একজন কার্টুনিস্ট। মাহিন আব্দুল্লাহ জানান,  আমি যে কাজটা সকলের কাছে জানিয়ে দেওয়ার জন্য ১০ দিন কষ্ট করতে হবে সেটা মিশু করলে হয়তো একদিনেই হয়ে যাবে। যেতুুে সকলের কাছে তার একটা গ্রহণযোগ্যতা আছে। মোরশেদ মিশু জানান, আমাদের কাজগুলো সংগঠনের মাধ্যমে করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কেননা সংগঠন পরিচালনা করা বিরাট দায়িত্ব। মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন মেঝো ভাই, আর আমি উদ্যোগটা সকলের কাছে পৌঁছে দেই।

বাসায় দাদির জন্য একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার কেনা হয়েছিল বেশ কয়েকবছর আগে। দাদি মারা যাওয়ার পর আর ব্যবহার করা হয়নি। একদিন পরিচিত এক ছোট ভাইয়ের বাবা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর অক্সিজেন সিলিন্ডার পাঠানো হয় সেখানে। সেখান থেকেই তাদের ভাবনা শুরু।

দুটি প্রতিষ্ঠানের সামাজিক উদ্যোগের প্রচারণায় যুক্ত হন মোরশেদ মিশু। সেখান থেকে সম্মানী পাঠানো হয় তাকে। মোরশেদ মিশুর ভাবনা—সেই টাকাগুলো সামাজিক কাজেই খরচ করবে। মেঝো ভাইকে জানানোর পর তিনি জানান, অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে কাজ করার কথা। একদিন মিশু এক ইন্ডাস্ট্রিয়াল বড় ভাইকে এ বিষয়ে জানায় এবং জানতে চান—তাদের প্রতিষ্ঠানে সিএসআর ফান্ড আছে কি না। তিনি ‘হ্যাঁ’ বললেন। তারপর দিন তিনি মিশুর একাউন্টে ২ লাখ টাকা পাঠিয়ে দেন। সেইসঙ্গে মিশু নিজের ৫০ হাজার টাকা যোগ করে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এক করেন। তারপর শুরুতে এক লাখ টাকা যারা ফেসবুকে ঘোষণা দেওয়ার পর ইনবক্সে সাহায্য চেয়েছিলেন তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। তারপর হাতে থাকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায়

অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত হই। মিশু বলেন, আমরা চট্টগ্রাম এবং ঢাকায় নানান জায়গায় খোঁজ নিতে থাকি। সর্বশেষে ঢাকা থেকেই প্রথম ধাপে ১২ লিটারের টাঙ্কি সহ ১৫টি অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনলাম। প্রথম ধাপে ১০ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করেছি একটা সিলিন্ডার কেনার জন্য। আমরা দাদির সেই সিলিন্ডারসহ মোট ১৬টি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে কাজ শুরু করলাম। আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের উদ্যোগ সম্পর্কে জানাই। অনেকেই আমাদের উদ্যোগে যুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।  আমরা ১০ দিন পর্যবেক্ষণ করলাম কেমন চাহিদা রয়েছে। সেই পর্যন্ত আমরা পাঁচটি সিলিন্ডার মানুষের বাসায় পৌঁছে দিয়েছি। আমরা তখন দ্বিতীয় ধাপে কাজ শুরু করলাম ৩৫টি সিলিন্ডার কেনার লক্ষ্য নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সকলকে বিষটি জানানোর পর অনেকেই এগিয়ে এলেন। আমরা ঈদের আগের দিন ফান্ড রাইজিং চালু রাখি। দ্বিতীয় ধাপে সাড়ে চার লাখ টাকার বেশী চলে আসে। দ্বিতীয় ধাপে কাজ করার কথা জেনে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বড় ভাই আবারও ২৫টি সিলিন্ডার কেনার জন্য ২ লাখ ৬২ হাজার টাকা আমাদের কাছে পৌঁছে দেন (তিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে চান না)। এছাড়া প্রিয় মানুষ, কাছের বড় ভাই, ছোট ভাই, অপরিচিত অসংখ্য মানুষ এগিয়ে আসে। আমরা ঈদের দিন আরো ১৬টি অক্সিজেন সিলিন্ডার হাতে পাই।’

তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় ধাপে ৯ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করতে হয় প্রতিটি অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য। আমাদের কাছে মোট ৩২টি অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে। চট্টগ্রামে আমরা ৫টি অক্সিজেন সিলিন্ডার পাঠাব, জয়পুরহাটে ৫টি ও নোয়াখালীতে ২টি। আর ঢাকায় রয়েছে মোট ২০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার।’ মাহিন আবদুল্লাহ বলেন, ‘চাহিদা অনেক কম—এটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। আমাদের দেশের মানুষ সুস্থ আছে এতেই আমরা খুশি। আমাদের দেশের মানুষ যদি বিপদের সম্মুখীন হয় তবে আমাদের জায়গা থেকে যতটুকু সাহায্য করতে পারি তার জন্যই এই উদ্যোগ। আমাদের এই উদ্যোগে সবসময় আমাদের পাশে আছেন দেলোয়ার খান এবং জুনায়েদ এহসান। অক্সিজেনের ঝাড়গুলো যেহেতু একটা ডিববা। আর আমাদের এটার সঙ্গে একটা ভালোবাসা জড়িয়ে আছে। আমরা চাচ্ছিলাম বিষয়টা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরবরাহ করব। সেহেতু নাম দিলাম ‘ভালোবাসার ডিব্বা’।  যাদের প্রয়োজন হয় অক্সিজেনের তারা যোগাযোগের জন্য দেওয়া নম্বরে কল করে বিস্তারিত জানান। তারপর আমরা কিছু ডকুমেন্টস চাই তাদের কাছ থেকে। প্রাথমিক একটা যাচাই-বাছাই করে অক্সিজেন সিলিন্ডার নেওয়ার জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। যদি তারা আসতে না পারেন তবে আমরাই পাঠিয়ে দেই।

ভালোবাসার ডিব্বা নিয়েছে এমন কিছু মানুষের গল্প শুনতে চাইলে তিনি জানান, একজন রোগীর বয়স ৯৫ বছর। তিনি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন না। কিন্তু তিনি কোনোভাবে আমাদের পোস্টার দেখতে পান এবং নম্বর সংগ্রহ করে কল করেন। আমরা সেদিন রাত ১টায় অক্সিজেন সিলিন্ডার তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। অন্যজন আলহেরা, দুদিনের মধ্যে তিনি সুস্থ হন এবং আমাদের প্রতি খুশী হয়ে সিলিন্ডার দিয়ে যাওয়ার সয়ম এক হাজার টাকা দিয়ে যান সিলিন্ডার রিফিল করার জন্য। তবে তৃতীয় ধাপে আর এ কাজ শুরুর পরিকল্পনা নেই। আমাদের কাছে যে টাকা রয়েছে পরিস্থিতি অনুযায়ী সেগুলো ব্যবহার  করব।’