বাংলাদেশে একটি সাধারণ দৃশ্য হইল, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ভয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বদা তটস্থ থাকা। চুন হইতে পান খসিয়া পড়িলেই বিপদ। অকস্মাত্ নামিয়া আসে বদলির খড়্গ। ইহা শুধু বর্তমান সরকারের আমলেরই চিত্র নহে, অতীতের যে কোনো সরকারের সময়ও লক্ষ করা গিয়াছে এমন প্রবণতা। বিশেষ করিয়া তৃণমূল পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসনে যাহারা কাজ করেন, তাহারা সর্বদা একরকম ভয়ভীতির রাজ্যে বসবাস করিয়া থাকেন। অনেক সময় বাঁশের চাইতে কঞ্চি বড় হইয়া দেখা দেয় এবং পাতিনেতারা ছড়ি ঘুরাইতে থাকেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করিবার পরও এই পরিস্থিতি আর কতদিন বিরাজ করিবে তাহা আমরা কেহ জানি না। এই যেমন গতকাল বৃহস্পতিবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত নাটোরের একটি খবরের প্রসঙ্গেই বলা যাইতে পারে। এখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে নাটোরের পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক কর্তৃক যেইভাবে মারধর করিবার অভিযোগ উঠিয়াছে, তাহা যে কেহ শুনিলেই আঁতকাইয়া উঠিবেন। সামান্য বাগিবতণ্ডায় তিনি উত্তেজিত হইয়া সেই প্রকৌশলীর গলা চাপিয়া ধরেন এবং কিল-ঘুষি মারিতে থাকেন। ইহাতে তাহার ঠোঁট কাটিয়া যায় এবং হাত ও মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত লাগে। একজন সরকারি কর্মকর্তার উপর এই ধরনের বর্বরোচিত হামলা নিন্দনীয় ও ন্যক্কারজনক নিঃসন্দেহে।
সেই প্রকৌশলীর অপরাধ কী? তাহার অপরাধ তিনি আত্রাই নদী ও নাগর নদ হইতে নাটোর সিংড়া পৌর এলাকা রক্ষা প্রকল্পের কাজে শিডিউল মোতাবেক মানসম্মত টাইলস লাগাইতে নির্দেশ দিয়াছিলেন ঠিকাদারকে। কিন্তু ঠিকাদার তাহা করিতে অস্বীকৃতি জানায়। বলা বাহুল্য, এইখানে এই ঠিকাদার হইলেন অভিযুক্ত ব্যক্তির বাবা। তিনি নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ। অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য হইল, ঘুষ চাহিয়া না পাওয়ায় প্রকৌশলী তাহার বাবার মুখে ফাইল ছুড়িয়া মারিয়াছেন। কোনো সরকারি কর্মকর্তার এমন আচরণ অনুচিত বটে। তিনি মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করাসহ কালো তালিকাভুক্ত করিবার উদ্যোগ লইতে পারিতেন। তবে প্রকৌশলীর গায়ে হাত তুলিবার অপরাধ অধিক মারাত্মক। কেননা এইভাবে কোনো প্রশাসন চলিতে পারে না। তাহা ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের যখন-তখন দুর্নীতিবাজ বলা যায় না। কেহ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকিলে তাহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করা যায়। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিকট পেশ করা যায় লিখিত অভিযোগনামা। কোনো সেক্রেটারির বিরুদ্ধেও যদি কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকে, তাহা হইলে কেবিনেট সেক্রেটারিকে বিষয়টি অবহিত করা যায়। তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করিলে ইহার যে বিকল্প নাই, তাহা নহে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উচিত সর্বদা নিয়মকানুনের মধ্যে থাকা। নিয়মের মধ্যে থাকিলে তাহাদের কীসের ভয়? কিন্তু তাহারা এই ক্ষেত্রে অকুতোভয়ের পরিচয় দিতে না পারিয়া নিজেরা ডুবিতেছেন, রাষ্ট্রকেও ডুবাইতেছেন। একই সঙ্গে একশ্রেণির নেতা-পাতিনেতারা সরকারি কর্মকর্তাদের হুমকি-ধমকি প্রদান ও গায়ে হাত তুলিবার স্পর্ধা ও দুঃসাহস পাইতেছেন কোত্থেকে?
আশার খবর হইল, সেই অভিযুক্ত ব্যক্তি ইতিমধ্যে মারধর ও সরকারি কাজে বাধা এবং হত্যাচেষ্টার মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হইয়াছেন। নাটোরের পুলিশ প্রশাসন এই ক্ষেত্রে যে নিঃসন্দেহে দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দিয়াছেন। তবে আমাদের মনে রাখিতে হইবে, ইহা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নহে। সমগ্র দেশেই এমন ঘটনা ঘটিতে দেখা যায় প্রায়শই। সরকারের ভাবা উচিত, যদি ইহার প্রতিক্রিয়ায় সরকারি কর্মকর্তারা পিঠ উলটাইয়া দেয়, তখন কী অবস্থা হইবে? ইহাতে সবকিছু কি অচল হইয়া পড়িবে না? এই জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের উপর যেইখানেই হামলা হউক না কেন, আমরা বরাবরই তাহার তীব্র নিন্দা জানাইয়া আসিতেছি। এখানে রুলিং পার্টি তথা সরকারি দলের নাম ভাঙাইয়া দলের বিভিন্ন উপ-সম্পাদকরা পর্যন্ত অনেক সময় বেপরোয়া আচরণ করিয়া থাকেন। তাহাদের লাগাম অবশ্যই টানিয়া ধরিতে হইবে এবং সবাইকে থাকিতে হইবে আইন-কানুনের মধ্যে।
