গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি

আপডেট : ২৮ মে ২০২১, ২১:১৩

একটি রাষ্ট্রের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু বলা হয় পরিবারকে। এখানে রয়েছে নানান কাজ। যেমন: সন্তান লালনপালন ও লেখাপড়া, রান্না, গৃহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, খাদ্য সংগ্রহ, খাদ্য সংরক্ষণ, খাবার পরিবেশন, প্রবীণদের সেবা, উত্সব আয়োজন, অতিথি আপ্যায়ন, সামাজিক যোগাযোগ ইত্যাদি। সামাজিক প্রথা অনুসারে সিংহভাগ কাজ করছেন আমাদের মা-বোন, ঘরের বউ, চাচি-মামি, খালা-ফুফু তথা নারীসমাজ। তারা নীরবে গৃহস্থালির সমস্ত কাজ নিপুণভাবে করে চলছেন। কিন্তু এইসব কাজের শ্রমমূল্য, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বীকৃতি কি তাঁরা পাচ্ছেন?!

দেশের সিংহভাগ পরিবার দারিদ্র্যকবলিত, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির। আমাদের সংসারে নারীরা কাজ করেন আনন্দচিত্তে। প্রত্যক্ষ কোনো প্রতিদান তাঁরা প্রত্যাশা করেন না। চান শুধু নিজ পরিবারের কল্যাণ। কৃষিপ্রধান এদেশে নারীসমাজের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে তাঁরা শুধু সাংসারিক কাজ নয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রাখেন। কৃষি পরিবারে একজন নারী কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তাছাড়া বসতভিটায় হাঁস-মুরগি পালন, গবাদি পশু পালন, শাকসবজি চাষ ও ফলদ বৃক্ষ রোপণ করেন। অথচ দেশের অর্থনীতিতে নারীসমাজের এ অবদানকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

গৃহস্থালির কাজে নারীর ভূমিকাকে আর্থিক মানদণ্ডে বিবেচনায় আনতে মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে নারী মৈত্রী, অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)সহ বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন সময়ে গবেষণা ও সেমিনার পরিচালনা করেছে।

নারীর গৃহকর্মে শ্রমমূল্য ও মর্যাদা বিষয়ক মানবিক দাবি নির্ধারণ করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-২০১৫ ঘোষণা করেছে। এ ঘোষণার মাধ্যমে নারীর গৃহস্থালির কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এসডিজি ২০১৫-এর অন্যতম লক্ষ্য ‘নারী-পুরুষের সমতা’ বিধান। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ৫.৪ নম্বর সূচকে উল্লেখ আছে, ‘সরকারি সেবা, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তা নীতিমালার মাধ্যমে অবৈতনিক ও গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন করা। পরিবার ও পারিবারিক দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে উপযুক্ত করে তুলে ধরা।’ নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এ দায়িত্ব রাষ্ট্রীয়ভাবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওপর অর্পিত। আমি একজন পেশাদার সমাজকর্মী। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মী হিসেবে নারীর শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সমাজের সকল পক্ষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।

পারিবারিক যত্ন-স্নেহ-ভালোবাসায় আমাদের সবার বেড়ে ওঠা। নারী-পুরুষ প্রত্যেকের বর্তমান অবস্থানের জন্য একটি পরিবারের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ জড়িত। যার নেপথ্যে নারীসমাজের ভূমিকা অনন্য। আমার স্ত্রী একজন কলেজশিক্ষিকা। পেশাজীবী হিসেবে তিনি কি শুধু শিক্ষকতা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন? নিশ্চয়ই না। গৃহকর্ত্রী হিসেবে সমস্ত কাজ ও সামাজিক দায়িত্ব তাঁকে যথাযথভাবে পালন করতে হচ্ছে। দেশে নারীশিক্ষার হার দ্রুত বাড়ছে। একইসঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে নারীর কর্মসংস্থান। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতিবন্ধকতা অনেক। যেমন: যানবাহনের অভাব, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রের অভাব, শৌচাগারের অভাব, মাতৃত্বকালীন ছুটির অপ্রতুলতা ও অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ইত্যাদি। সব প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে নারীসমাজ পরিবার ও কর্মস্থল উভয় ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করছে। জাতীয় উত্পাদনে নারীরাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।

গৃহকর্মে অবদান প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিডিপি)-এর ২০১৮ সালে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, গৃহ ও গৃহস্থালির কর্মে নারীর নীরব অবদানের অর্থমূল্য ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংসারে একজন নারী পুরুষের তুলনায় ৩ গুণ বেশি মজুরি বিহীন কাজ করে। গৃহকর্মে নারী দৈনিক সময় ব্যয় করে ৭.৭ ঘণ্টা এবং পুরুষ সময় ব্যয় করে ২.২ ঘণ্টা। কয়েকবছর আগে জাতিসংঘ কর্তৃক এ ধরনের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, মেয়েদের গাহর্স্থ্য শ্রমকে যদি অর্থের হিসাবে বিবেচনা করা হতো, তবে যে কোনো দেশের জাতীয় আয় ৩৯ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি হতো।

অর্থনীতিবিদ ও নারী নেত্রীগণ গৃহস্থালির সেবামূলক কাজকে মোট জাতীয় উত্পাদনে (GDP) অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলছেন। তাঁদের প্রস্তাব জাতীয় পর্যায়ে একটি ‘স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ খুলে গৃহকর্মের শ্রমমূল্য পরিমাপ করা যেতে পারে। নারীর শ্রমমূল্য পরিমাপ, মূল্য পরিশোধকারী কে এবং কী হারে পরিশোধ করা হবে ইত্যাদি বিষয়ে সামাজিক গবেষণা প্রয়োজন। নারীরাও দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার। তাই মোট জাতীয় উত্পাদনে নারীর অবদান বিবেচনা করে সর্বজনীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করতে হবে।

চট্টগ্রাম