কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালায় অসংগতি

আপডেট : ৩০ মে ২০২১, ২১:১২

বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি ও পল্লি ঋণের সুদের হার ১ শতাংশ কমিয়ে ৮ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এর আগে ২০১৭ সালের ২২ জুন কৃষি ঋণের সুদের হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। তখন ব্যাংকগুলো সাধারণ ঋণের ক্ষেত্রে ১২-১৩ শতাংশ হারে সুদ চার্জ করত। সেই সময়ও কৃষি ও পল্লি ঋণের সুদের হার ছিল ৯ শতাংশ। ফসলি ঋণ ছাড়া তখন এটাই ছিল প্রচলিত ধারার ব্যাংক ঋণের সুদের সর্বনিম্ন হার। উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক শিডিউল ব্যাংকগুলোর জন্য সুদের হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দিলেও কৃষি ও পল্লি ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশই বহাল ছিল। ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো ৯ শতাংশ হারে ঋণদানের বিপরীতে বেশ কিছু দাবি আদায় করে নেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, আমানতের ওপর সুদের হার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ নির্ধারণ এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত আমানতের ৫০ শতাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকে সংরক্ষণের ব্যবস্থাকরণ। আগে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত আমানতের ২৫ শতাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোয় সংরক্ষণ করা যেত।

সাধারণভাবে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়ার সময়ই কৃষি ও পল্লি ঋণের সুদের হার আনুপাতিক হারে কমানো প্রয়োজন ছিল। সাধারণ ঋণের সুদের হার যদি ১২-১৩ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, তাহলে কৃষি ও পল্লি ঋণের সুদের হার মাত্র ১ শতাংশ কমানো হলো কেন? আনুপাতিক হারে কমালে তো কৃষি ও পল্লি ঋণের সুদের হার থেকে ৬ বা ৭ শতাংশ হওয়া উচিত ছিল। কৃষি ও পল্লি ঋণের সুদের হার কমানোর চেয়ে ঋণ নীতিমালায় বিদ্যমান অসংগতি দূর করা বেশি প্রয়োজন। ঋণ বিতরণব্যবস্থার অসংগতির কারণে এই ঋণদান কার্যক্রম পল্লি এলাকার উদ্যোক্তাদের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সুবিধা দিতে পারছে না।

উল্লেখ্য, কৃষি ও পল্লি ঋণ সাধারণ কৃষি ঋণ নয়। পল্লি এলাকা কৃষিভিত্তিক সম্ভাব্য উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং বিদ্যমান উদ্যোক্তাদের পুঁজি সহায়তা দেওয়ার জন্যই এই অগ্রাধিকারমূলক ঋণদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। গত কয়েক বছর ধরে প্রতি বছর ২৩-২৪ হাজার কোটি টাকা এই খাতে বরাদ্দ করা হচ্ছে। শিডিউল ব্যাংকগুলোকে প্রতি বছরের জন্য কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কোনো ব্যাংক নির্ধারিত টার্গেট অনুযায়ী কৃষি ও পল্লি ঋণদানে ব্যর্থ হলে তার অনার্জিত টার্গেটকৃত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সুদবিহীন হিসাবে সংরক্ষণ করে থাকে। পরবর্তী বছর সেই ব্যাংকের রেটিং খারাপ হয়ে যায়। তাদের নতুন শাখা খোলার ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। অন্য কোনো ঋণদান কার্যক্রমে এমন বিধিনিষেধ আরোপিত নেই। সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করা। এই লক্ষ্যে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য সার্বিক সহযোগিতাদানের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে কৃষিনির্ভরতা থেকে ক্রমশ শিল্পায়নের দিকে ধাবিত করা।

কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি করা হয়েছে অন্যত্র। কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণ নীতিমালায় বলা হয়েছে, শিডিউল ব্যাংকগুলো যদি সরসারি এই ঋণ গ্রামীণ এলাকার উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করে, তাহলে তারা ৮ শতাংশ সুদ আরোপ করতে পারবে। একজন উদ্যোক্তাকে ব্যাংক ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে। ঋণের দলিলায়ন সম্পন্ন করতে ১৫-১৬ হাজার টাকা জামানত দিতে হয়। ব্যাংক যদি এনজিও হোলসেল লিংকেজে ঋণ দান করে, তাহলে সে ক্ষেত্রেও ব্যাংক ৮ শতাংশ সুদ চার্জ করবে। এখন প্রশ্ন হলো, এনজিওগুলো যখন তৃণমূল পর্যায়ে, অর্থাত্ পল্লি এলাকার উদ্যোক্তাদের কাছে এই ঋণ বিতরণ করবে, তখন তারা কত সুদ চার্জ করবে? এ ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, এনজিওগুলো তৃণমূল পর্যায়ে ঋণ বিতরণকালে মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) কর্তৃক নির্ধারিত সুদের হার প্রয়োগ করবে। পল্লি এলাকার একজন সাধারণ কৃষকের পক্ষে এমআরএ নির্ধারিত সুদের হার কত, তা জানার কথা নয়। আগে এমআরএ নির্ধারিত সুদের হার ছিল ২৭ শতাংশ, এখন তা ২৪ শতাংশ। তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়াচ্ছে? পল্লি এলাকার একজন উদ্যোক্তা যদি ব্যাংক থেকে কৃষি ও পল্লি ঋণ গ্রহণ করেন, তাহলে তাকে ৮ শতাংশ সুদ দিতে হবে। আর সেই একই ঋণ যদি এনজিওর মাধ্যমে গ্রহণ করেন, তাহলে সুদের হার দাঁড়াবে ২৪ শতাংশ। কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের কোনো অবস্থাতেই লোকসান নেই। কারণ, তারা সরাসরি গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণ দিলে ৮ শতাংশ সুদ পাবে। আবার সেই একই ঋণ তুলনামূলক কম পরিশ্রমে এনজিওগুলোর মাধ্যমে দিলেও ৮ শতাংশ সুদ পাবে। কিন্তু সব দিক থেকেই বিপদে পড়েছেন পল্লি এলাকার উদ্যোক্তারা। তারা ব্যাংকে গেলে ব্যাংক কর্মকর্তারা তাদের ঋণ দিতে চান না। উদ্যোক্তাদের কাছে নেই এমন সব ডকুমেন্ট চাওয়া হয়। একশ্রেণির ব্যাংকারের উদ্দেশ্যই থাকে কীভাবে আবেদনকারীকে ঋণ না দিয়ে ব্যাংক থেকে ফিরিয়ে দেওয়া যায়। শিডিউল ব্যাংকগুলোর অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনা এমন যে, তারা নির্দিষ্ট সংখ্যক বড় ক্লায়েন্টকে ঋণ দিতে অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তা ছাড়া, সরাসরি কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণে পরিশ্রম ও ঝুঁকি বেশি। কারণ, প্রতিজন আবেদনকারীকে ১০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হলে ২০০ জন উদ্যোক্তাকে ২০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া যাবে। কিন্তু একটিমাত্র এনজিওকেই ২০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া সম্ভব। এতে টার্গেট পূরণ করাও সহজ। এনজিওগুলোর কাছ থেকে ঋণ পেতে তেমন কোনো আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন হয় না। যে কেউ ইচ্ছা করলেই এনজিওগুলোর কাছ থেকে ঋণ নিতে পারেন। তাই পল্লি এলাকার উদ্যোক্তাগণ ব্যাংকের পরিবর্তে এনজিওগুলোর কাছ থেকে ঋণ নিতেই বেশি আগ্রহী। একটি এনজিওকে সর্বোচ্চ কত টাকা কৃষি ও পল্লি ঋণ দেওয়া যাবে, তা নির্ধারিত নেই। এতে চূড়ান্ত ফলাফল কী দাঁড়াচ্ছে? কৃষি ও পল্লি ঋণ কার্যক্রমের দ্বারা ব্যাংক তার নির্ধারিত মুনাফা তুলে নিতে পারছে। এনজিওগুলো ৮ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে তা ২৪ শতাংশ সুদে টার্গেট গ্রুপের কাছে বিতরণ করতে পারছে।

এখানে ব্যাংক ও এনজিও উভয়েই লাভবান হচ্ছে। কিন্তু টার্গেট গ্রুপ যে পল্লি উদ্যোক্তা, যাদের জন্যই ঋণদান কার্যক্রম, তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকেই বলে থাকেন, এনজিওগুলোর মাধ্যমে বেশি সুদে ঋণ নিলেও তো পল্লি এলাকার উদ্যোক্তারা অর্থায়ন সুবিধা পাচ্ছেন—এটাই বা কম কীসের? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হচ্ছে, গ্রামীণ উদ্যোক্তাগণ তো এমনিতেই বেশি সুদে এনজিও অথবা গ্রামীণ মহাজনের কাছ থেকে অর্থায়ন পেতে পারেন। উদ্যোক্তাদের কাছে অর্থ পৌঁছানোটাই বড় কথা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, তারা তুলনামূলক স্বল্প সুদে সহজ শর্তে ঋণ পাচ্ছেন কি না। সেটা যদি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এ ধরনের ঋণদান কার্যক্রমের কোনোই আবশ্যকতা নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলেই খুব সহজে এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। যেমন নীতিমালায় শর্ত যুক্ত করা যেতে পারে যে, শিডিউল ব্যাংক যদি সরাসরি পল্লি এলাকার উদ্যোক্তাদের মধ্যে কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণ করে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সিডিউল ব্যাংকগুলো শূন্য দশমিক ১ শতাংশ সুদে ঋণের অর্থ সরবরাহ করবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সেই অর্থ এনজিওগুলোর কাছে সরবরাহ করবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ১ শতাংশ সুদ আরোপ করবে। আর এনজিওগুলো সেই ঋণ ৪ শতাংশ সুদে গ্রাহকদের প্রদান করবে। এনজিওগুলো গ্রাহকদের ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দিলেও তারা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ ভর্তুকি পাবে। ফলে এনজিওগুলোর চূড়ান্ত সুদের হার দাঁড়াবে সাড়ে ৮ শতাংশ। করোনাকালে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ নীতিমালায় এ ধরনের শর্ত আরোপিত হয়েছে। কাজেই কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে এই নীতিমালা অনুসরণ করা যেতে পারে।

n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক