ইউরোপের রাজত্ব চেলসির হাতে

আপডেট : ৩০ মে ২০২১, ২১:৩০

স্পোর্টস ডেস্ক

মাঠে দুই দলের ফুটবলাররা যতটা না লড়াই করলেন তার চেয়ে বেশি লড়াই হয়েছে ডাগআউটে দুই কোচের মধ্যে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোচ গার্দিওয়ালা এবং চেলসির কোচ থমাস টুখেলের দিকে দর্শকের বাড়তি নজর ছিল। কারণ এই কোচই খেলার পার্থক্যটা গড়ে দেবেন। মাঠের কাজটা সারবেন খেলোয়াড়রা। যেভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন খেলোয়াড়রা সেভাবেই কাজে লাগিয়েছেন। দিন শেষে জয়ের গৌরব মাথায় তুলল চেলসি। হারের গ্লানি নিয়ে মাঠ ছাড়ল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। কাই হাভার্টজের গোলে চেলসি (১-০) ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন লিগের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।  

শনিবার রাতে পোর্তোর দ্রাগাও স্টেডিয়ামে অল ইংলিশ ফাইনালের ইউরোপ সেরার মঞ্চে এক দশক পর ঘরে তুলেছে ইউরোপ সেরার ট্রফি। ফাইনালের মহারণে লন্ডনের ক্লাবটির একমাত্র গোলটি করেন জার্মানির উদীয়মান ফুটবলার কাই হাভার্টজ।

প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠে শিরোপা স্বপ্নে বিভোর ম্যানসিটিকে মাঠে অতি আক্রমণাত্মক ছকেই খেলতে পাঠান গার্দিওলা। শিরোপা লড়াইয়ে সাধারণত মৌসুমের সেরা একাদশই খেলান কোচরা। গার্দিওলা এখানেই ভুল করেন। আক্রমণে মৌসুম জুড়ে অফ-ফর্মে থাকা রাহিম স্টার্লিংকে নামিয়ে দেন। যিনি পুরো ম্যাচেই ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। এ ছাড়াও চেলসির পালটা-আক্রমণ সামলানোর কথা মাথায় না রেখেই গার্দিওলা হোল্ডিং মিডফিল্ডে রাখেননি রদ্রি বা ফের্নান্দিনিওর কাউকে। যার চড়া মাসুল ম্যাচ হেরে শিরোপা স্বপ্ন খুইয়েই দিয়েছে সিটিজেনরা।

সিটির বুকে শেল বিঁধে ম্যাচের ৪২ মিনিটে। মেসন মাউন্টের ডিফেন্স চেরা পাস দারুণ দক্ষতায় নিয়ন্ত্রণ করে সিটির আগুয়ান গোলরক্ষক এডারসনকে বোকা বানিয়ে জালে জড়ান ২১ বছর বয়সি হাভার্টজ। চ্যাম্পিয়নস লিগে এই ফরোয়ার্ডের প্রথম গোলের জবাব ম্যাচের বাকি সময় শত চেষ্টাতেও দিতে পারেনি সিটি। পারবে কি করে, চেলসির রক্ষণভাগ এদিন যে ছিল ইস্পাতদৃঢ় মজবুত। ইনজুরির কারণে রক্ষণের মূল ভরসা থিয়াগো সিলভা প্রথমার্ধে মাঠ ছাড়লেও রুডিগার, এজপিলিকুয়েতারা দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যান শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত।

চেলসি অবশ্য আরো বড় ব্যবধানেই জিততে পারত। দলটির স্ট্রাইকার টিমো ভেরনারই প্রথমার্ধে গোলের দারুণ দুটি সুযোগ হেলায় হারান। বদলি হিসেবে নেমে ৭৩ মিনিটে সামনে এডারসন একা থাকলেও বল পোস্টের বাইরে মারেন ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিক। তবে তার সেই ভুলের চড়া মাসুল গুনতে হয়নি চেলসিকে। সিটিরও দুর্ভাগ্য। ইনজুরি সময়ে ষষ্ঠ মিনিটে ক্লাবটির ফরোয়ার্ড রিয়াদ মাহরেজ জালের ঠিকানা প্রায় খুঁজেই পেয়েছিলেন। তবে ডি বক্সের বাইরে থেকে তার বাঁ-পায়ের নেওয়া শটটি ক্রসবারের সামান্য ওপর দিয়ে চলে যায়। নিজের পাতা ফাঁদেই শিরোপা স্বপ্ন বিসর্জন দিলেও গার্দিওলা ম্যাচ শেষে সাফাই গেয়েছেন। বিতর্কিত দল নির্বাচন নিয়ে বার্সেলোনার হয়ে দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা এই কোচ বলেন, ‘আমি সেরা দলটাই নির্বাচন করেছিলাম। লিওঁ, পিএসজি, ডর্টমুন্ড (নকআউটে যাদের হারিয়ে এসেছে সিটি) ম্যাচের মতোই একাদশ বাছাই করেছি। আমার খেলোয়াড়রাও তা জানে।’ এরপর তিনি দল নিয়ে নিজের সন্তুষ্টির কথাও বলেন, ‘আমাদের জন্য এটা অসাধারণ এক মৌসুম ছিল। ফাইনাল আমাদের জন্য স্বপ্ন ছিল। দুর্ভাগ্যবসত আমরা জিততে পারিনি। আমরা চেষ্টা করেছি, তবে পারিনি।’  

গেল মৌসুমেও পিএসজির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে উঠেছিলেন টুখেল। সেবার বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হেরেছিল তার দল। পিএসজি থেকে ডিসেম্বরে ছাঁটাই হওয়ার পর চেলসির দায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন চার মাস আগে। মাত্র কয়দিনেই মৌসুমের শুরুর দিকে ধুঁকতে থাকা ব্লুজদের চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা এনে দেওয়ার পর তার প্রতিক্রিয়া ছিল দেখার মতো। শিরোপা বুঝে নেওয়ার পর তো ড্রেসিং রুমে ছাত্রদের উদ্যাপনের রঙঢঙ তিনিই শিখিয়েছেন। জানা গেছে, অভাবনীয় এ সাফল্যর পর চেলসি বোর্ড থেকে বড়সড় প্রোমোশন পেতে যাচ্ছেন তিনি। বেতন তো বাড়বেই, সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে রুশ ধনকুবের রোমান আব্রাহামোভিচের মালিকানাধীন ক্লাবটির দায়িত্ব পাবেন তিনি। আর তা হবে নাই বা কেন। মাত্র চার মাসেই একটা অগোছালো দলকে নিয়ে ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জেতা কি চাট্টিখানি কথা? 

৩ টানা তৃতীয় জার্মান কোচ হিসেবে দলকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতালেন টমাস টুখেল। ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় এর আগে একবারই এমন ঘটনা ঘটেছিল। ১৯৮০-৮২ সাল পর্যন্ত তিন ইংরেজ কোচ হিসেবে দলকে ইউরোপিয়ান কাপ এনে দিয়েছিলেন ক্লো, পাইসলি এবং বার্টন।  

৯ এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগে চেলসি গোলরক্ষক এডুয়ার্ড মেন্ডির ক্লিনশিট সংখ্যা। অভিষিক্ত মৌসুমে আর কোনো

গোলকিপারের এত ম্যাচে নিজেদের জাল অক্ষুণ্ন রাখার রেকর্ড নেই। এদিকে, প্রথম আফ্রিকান ফুটবলার হিসেবেই তো শনিবার রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপাটা ছুঁয়ে দেখলেন তিনি।  

১ ম্যানচেস্টার সিটির ম্যানেজার হিসেবে প্রথম কোনো ফাইনালে হারলেন পেপ গার্দিওলা। এর আগে, ২০১০-১১ মৌসুমে মেজর কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনালে হারের মুখ দেখেছিলেন এই স্প্যানিয়ার্ড। বার্সেলোনার হয়ে কোপা দেল রেতে।

১ ইলকায় গুনদোয়ানের পর চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজের অভিষিক্ত গোল ফাইনালে পেলেন চেলসির কাই হাভার্টজ। ২০১৩ সালে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে ফাইনালে বায়ার্নের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করেছিলেন এই মিডফিল্ডার। 

৩ মাত্র দ্বিতীয় কোচ হিসেবে পেপ গার্দিওলার বিপক্ষে পরপর তিন ম্যাচে জয় দেখলেন টুখেল। গার্দিওলার বিপক্ষে আর এই রেকর্ড আছে শুধু ইয়ুর্গেন ক্লপের। লিভারপুলের হয়ে ২০১৮ সালে গার্দিওলার বিপক্ষে তিন দেখাতেই জিতেছিলেন ক্লপ।

৬ মেজর ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় সাত ফাইনালের ছয়টিতে জয়ের রেকর্ড গড়ল চেলসি। এর মধ্যে চারটি আবার রোমান আব্রাহামোবিচ লন্ডনের ক্লাবটির মালিকানা কেনার পর (চ্যাম্পিয়নস লিগ ২০২০-২১, ২০১১-১২; ইউরোপা লিগ ২০১২-১৩, ২০১৮-১৯)

৮ প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ওঠা সর্বশেষ আট দলই হেরেছে ফাইনালে। টটেনহাম, পিএসজি, সিটি—টানা তৃতীয় বছর রানার্সআপ হলো প্রথমবার ফাইনাল খেলা দল। প্রথমবার ফাইনালে উঠেই চ্যাম্পিয়ন হওয়া সর্বশেষ দল বরুসিয়া ডর্টমুন্ড (১৯৯৭)।