কেন বাড়িতেছে নিষ্ঠুরতা?

আপডেট : ০১ জুন ২০২১, ২১:০৩

রাজধানীতে এক নারী চিকিত্সককে হত্যার পর তাহার লাশ পুড়াইয়া ফেলিবার চেষ্টা করা হইয়াছে। হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঘটনাস্থলে গিয়াছিল সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট। ক্রাইম সিন জানাইয়াছে, ঐ নারী চিকিত্সককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হইয়াছে। ধারালো অস্ত্র দিয়া আঘাতের পর ঐ চিকিত্সকের তোশকে আগুন ধরাইয়া দেওয়া হয়।

আমরা দেখিতে পাইতেছি, বিগত কয়েক বত্সর ধরিয়া ‘নিষ্ঠুরভাবে’ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছে। সংবাদপত্রে এই ধরনের ঘটনার অসংখ্য উদাহরণ রহিয়াছে। প্রশ্ন হইল—মানুষ কখন বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া পড়ে? কখন একজন মানুষ আরেক জনকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করিতে কুণ্ঠিত হয় না? কখন সমাজে এই ধরনের অপরাধ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতে থাকে? মনে রাখিতে হইবে, বাস্তবে এই ধরনের পশুবত্ ঘটনা যত ঘটে, সংবাদপত্রে তাহার বড় একটি অংশই অপ্রকাশিত থাকিয়া যায়। অর্থাত্ প্রকৃত চিত্র, সংবাদপত্রে যাহা উঠিয়া আসে, তাহা হইতে অধিক কুিসত। এই সকল ঘটনাকে ‘পশুবত্’ বলাটাও সম্ভবত যথার্থ হইবে না। কেননা, অনুভূতিপ্রবণ পশুরাও নিশ্চয়ই এতটা হীন আচরণ করে না। আরো প্রশ্ন তোলা যাইতে পারে—সমাজের তলে তলে বহিয়া চলা নৃশংসতার এই চোরাস্রোত বন্ধ হইবে কী করিয়া? যাহারা এমন নিষ্ঠুর মানসিকতার অন্ধকূপে আটকাইয়া গিয়াছে, তাহারা কী করিয়া এমন অস্বাভাবিক হইল? ‘সামাজিক মূল্যবোধ’ তৈরি করা এই ক্ষেত্রে অতি জরুরি একটি বিষয় বটে। তবে আরো একটি বৃহত্ দিক হইল মাদক। আমরা দেখিয়াছি, মাদকের নেশায় ছেলের হাতে খুন হইয়াছেন অনেক বাবা-মা। স্বামীর হাতে খুন হইয়াছেন অসংখ্য নারী। মাদকসেবন লইয়া বিরোধে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটিতেছে বিপুল সংখ্যায়। আমরা যে কত ধরনের মাদকের সাগরে ভাসিতেছি, তাহা এক কঠিন গবেষণার বিষয়। বাংলাদেশে কোন কোন রুট ধরিয়া এবং কীভাবে নূতন রুট তৈরি করিয়া মাদক পাচারের জাল বিছানো হইয়াছে—তাহার স্পষ্ট চিত্র পত্রিকান্তরে প্রকাশ হয় প্রায়শই। সম্প্রতি ইয়াবা মাদকের পাশাপাশি এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইইথ্যালামাইড) মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের চিত্র প্রকাশ পাইতেছে। এই মাদক সেবন করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নিজেই নিজের গলায় কোপ বসাইয়া আত্মহনন করিয়াছে। এই মাদকে ভয়াবহ মস্তিষ্ক বিকৃত ঘটে, তীব্র হেলুসিনেশন হয়। জানা গিয়াছে, ঢাকায় ১৫টি দল এলএসডি বিক্রয়কাজে সক্রিয় রহিয়াছে। নেপথ্যে আরো কত কে যে রহিয়াছে, তাহা কখনোই সম্পূর্ণভাবে  হয়তো জানা যাইবে না। যদিও ইতিপূর্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলিয়াছেন। মাদক নির্মূলে দেশব্যাপী ‘সাঁড়াশি অভিযান’ হইয়াছে ইতিপূর্বে। কিন্তু অনেকের মতে, উহা আসলে মাদকের ‘বিশাল হ্রদে’ ‘সামান্য ঢেউ’ মাত্র। প্রকৃত অর্থে, কাহারা মাদক ব্যবসায়ী, কাহাদের সহিত লেনদেন, কোথা হইতে কীভাবে আসিয়া দেশের একটি উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে পৌঁছাইয়া যায়—তাহা কে না জানে? প্রশাসন তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অগোচরে এই দুষ্কর্ম চালাইয়া যাওয়া অসম্ভব। বস্তুত, মাদকের কাঁচা অর্থের নিকট অনেক কর্মকর্তারই সততার দায়িত্বকে শিকায় তুলিয়া রাখেন। আসলে মাদকে যদি ৯০ শতাংশ অধিক লাভ হয়, তাহা হইলে এই ব্যবসা কেন ছাড়িবে মাদক ব্যবসায়ীরা? এত বিপুল কাঁচা টাকার লোভ সামলাইবার মতো ইস্পাতদৃঢ় আদর্শ অনেকের মধ্যেই নাই। এই কারণে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, সরিষার কত গভীরে ঢুকিয়া পড়িয়াছে মাদকের ভূত—তাহা কে দেখিবে? কে করিবে নির্মূল?

ইহা ঠিক যে, কেবল আমরা নহি, এই বিশ্বের অনেক বড় দেশও মাদকের সমস্যা নির্মূলে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করিবার পরও হিমশিম খাইতেছে। সুতরাং মাদক ও সামাজিক নানান অস্থিরতা সহজে নির্মূল হইবে না বলিয়াই মনে হইতেছে। ইহার মধ্যে অশনিসংকেত দেখিতে পাওয়া যাইতেছে বটে।