দেশের অর্থনৈতিক চাকা শক্তিশালী করতে সমুদ্র অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন ইত্যাদি সমুদ্র অর্থনীতিনির্ভর দেশের মতো বাংলাদেশেরও রয়েছে অপার সম্ভাবনাময় ব্লু-ইকোনমি। ঐতিহাসিক সমুদ্রবিজয় দেশের অর্থনীতিকে এক যুগান্তকারী সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। ব্লু-ইকোনমির সঠিক ব্যবহার ও যথাযথ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে সোনার বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
সমুদ্র থেকে আহরিত সম্পদকে দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। একটি হলো প্রাণিজ আর একটি হলো অপ্রাণিজ। মত্স্য সম্পদ, সামুদ্রিক প্রাণী, আগাছা, গুল্মলতা ইত্যাদি প্রাণিজ সম্পদের অন্তর্ভুক্ত। আর অপ্রাণিজের মধ্যে রয়েছে খনিজ ও খনিজাতীয় সম্পদ যথা—তেল, গ্যাস, চুনাপাথর ইত্যাদি। ১৯৯৪ সালে অধ্যাপক গুন্টার পাউলি সমুদ্র সম্পদনির্ভর টেকসই ও পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির ধারণা দেন এবং পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশ বিস্তৃত জলরাশিতে বিচিত্র সম্পদ ব্যবহার করে ভবিষ্যতের অর্থনীতির রূপরেখা তুলে ধরেন। বিশ্বের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ব্লু ইকোনমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের রয়েছে বিশাল সমুদ্রসীমানা, যেটি দ্বারা ব্লু ইকোনমিনির্ভর একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশে রূপান্তরিত করা যেতে পারে।
আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে কয়েক দশকের বিরোধ সফলভাবে মোকাবিলা করে ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল অন ল’স অব দ্য সি’স (ইটলস) এবং দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে আর ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটোরিয়াল সমুদ্র এলাকা পায় বাংলাদেশ। সঙ্গে আছে ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ-অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার। এই নীল জলরাশির মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিচিত্র সামুদ্রিক সম্পদ। তেল, গ্যাস, মূল্যবান বালু, ইউরেনিয়াম, মোনাজাইট, জিরকন, শামুক, ঝিনুক, মাছ, অক্টোপাস, হাঙর ইত্যাদি ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক প্রাণি ও খনিজ সম্পদ রয়েছে সাগরে। বঙ্গোপসাগর হচ্ছে মত্স্য সম্পদের বিশাল ভান্ডার। এখানে প্রায় ৫০০ প্রজাতির মাছ রয়েছে। আরো রয়েছে ২০ প্রজাতির কাঁকড়া, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, ৩০০ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক। এছাড়া রয়েছে টুনা মাছের মতো দামি ও সুস্বাদু মাছ, যার রয়েছে প্রচুর আন্তর্জাতিক চাহিদা। এই প্রাকৃতিক সম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে আমাদের জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার আমাদের অনেক আগে থেকে এই ব্লু ইকোনমি উত্তোলনের মধ্য দিয়ে তাদের রাষ্ট্রীয় কোষাগার চাঙ্গা করেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশও হাত গুটিয়ে বসে নেই। ২০১৭ সালে ‘ব্লু ইকোনমি সেল’ গঠন এবং সমুদ্রসম্পদ সুরক্ষায় ২০১৯ সালে মেরিটাইম জোন অ্যাক্ট করেছে সরকার।
পৃথিবীর তিন ভাগ জল। এই বাস্তবতায় পৃথিবীর দেশসমূহ তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত্ চাহিদা মেটাতে তাকিয়ে আছে সমুদ্রবক্ষে সঞ্চিত সম্পদের দিকে। ২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে প্রায় ৯০০ কোটি। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর খাবারের জোগান দিতে তখন সমুদ্রের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে। সেই লক্ষ্যে জাতিসংঘ ২০১৫ সাল-পরবর্তী যে টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তার মূল কথাই হচ্ছে ব্লু ইকোনমি। আর ব্লু ইকোনমির মূল ভিত্তি হচ্ছে টেকসই সমুদ্র নীতিমালা। বিশ্ব অর্থনীতিতে সমুদ্র অর্থনীতি বহুবিধভাবে অবদান রেখে চলেছে। বছরব্যপী ৩ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে সমুদ্রকে ঘিরে। বিশ্বের ৪৩০ কোটি মানুষের ১৫ শতাংশ প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ ও জীবজন্তু। পৃথিবীর ৩০ ভাগ গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে সমুদ্রতলের বিভিন্ন গ্যাস ও তেলক্ষেত্র থেকে। তাই বিশ্বব্যাপী সমুদ্রকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক বাজার ও কৌশলগত সমুদ্রপথ বিশ্বের প্রধান শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টায় রয়েছে।
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জ্ঞান বৃদ্ধির মাধ্যমে সমুদ্রনির্ভর ওষুধশিল্পও গড়ে তোলা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) অন্যতম পরিচালক ইন্দ্রয়োনো সয়েসিলো। তিনি আরো বলেছেন, ব্লু ইকোনমি একাধারে দেশের মানুষের খাদ্যের নিরাপত্তা বিধান করতে পারে এবং জিডিপি বৃদ্ধি করে জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধশালী করতে পারে। তাই আমাদের দেশে ব্লু ইকোনমি সঠিক বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক খাত চাঙ্গা করা সময়ের দাবি। এছাড়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের যে অঞ্চলের মালিকানা পেয়েছে, সেখানে অন্তত চারটি ক্ষেত্রে কার্যক্রম চালানো হলে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতি বছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা কোটি অর্জন করা সম্ভব। এই ক্ষেত্র চারটি হলো তেল-গ্যাস উত্তোলন, মত্স্য সম্পদ আহরণ, বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ ও পর্যটন। ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ তে সমুদ্র অর্থনীতি অগ্রাধিকার দেওয়ার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে, যাতে গুরুত্ব পাবে সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনা। এই ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে, আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে, পরিকল্পিতভাবে সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে হবে, যাতে আগামী দিনে ব্লু ইকোনমির সুফল ভোগ করতে পারে দেশের মানুষ।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
