চলতি একাদশ জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশন শুরু হয়েছে। সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল বুধবার বিকাল ৫টায় অধিবেশন শুরু হয়। এটি চলতি সংসদের তৃতীয় বাজেট অধিবেশন। আজ বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সংসদে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন।
সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন
অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন করেন স্পিকার। এবার অধিবেশনে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরা হলেন—শহীদুজ্জামান সরকার, এ বি তাজুল ইসলাম, মাজহারুল হক প্রধান, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, রুমানা আলী। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে তাদের মধ্যে অগ্রবর্তীজন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন।
শোক প্রস্তাব
চলতি সংসদের সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু ও মো. আসলামুল হকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়। সাবেক সংসদ সদস্য ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী, সাবেক এমপি মেরাজ উদ্দিন মোল্লা, গাজী ম ম আমজাদ হোসেন মিলন, খোন্দকার আব্দুল মালেক শহীদুল্লাহ, আবুল হাসেম, মাহবুবুর রহমান, মোহাম্মদ ইউনুস, জিয়াউর রহমান খান, আব্দুল বারী সরদার, দিলদার হোসেন সেলিম, আব্দুর রউফ খান ও ফরিদা রহমানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে সংসদ।
এছাড়া ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী, বাংলা একাডেমির সাবেক সভাপতি শামসুজ্জামান খান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের মা ফৌজিয়া মালেক, শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. সাহিদা আখতার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি হাসান শাহরিয়ার, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মিতা হক, লোকসংগীত শিল্পী ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, অভিনেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম মহসীন, পরিবেশ অধিদপ্তরের এ কে এম রফিক আহাম্মদ, সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা হারুন-উর-রশিদ, ও অভিনেতা ওয়াসিমের মৃত্যুতেও শোক প্রকাশ করা হয়। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশ-বিদেশে যারা মারা গেছেন তাদের মৃত্যুতেও সংসদ শোক জানায়। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে নৌ-দুর্ঘটনা, ফিলিস্তিনে ইসরাইলি হামলায় নিহত, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে ভারত ও বাংলাদেশে হতাহতদের জন্যও শোক প্রকাশ করা হয়।
শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা
রেওয়াজ অনুযায়ী চলমান সংসদের কোনো সদস্য মারা গেলে তার ওপর আনীত শোক প্রস্তাবের ওপর অধিবেশনে প্রথম বৈঠকে আলোচনা হয়। কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মতিন খসরু গত ১১ মার্চ মারা যান। এছাড়া গত ৪ এপ্রিল মারা যান ঢাকা-১৪ আসনের সদস্য আসলামুল হক। এই দুই জনের মৃত্যুতে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার আগে সরকারি ও বিরোধী দলের আরো কয়েক জন সদস্য আলোচনায় অংশ নেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, প্রয়াত মতিন খসরুকে আমি ৫০ বছর ধরে চিনি। প্রথমে তাকে দেখেছি ছাত্রনেতা হিসেবে। পরে রাজনৈতিক নেতা, এমপি ও মন্ত্রী হিসেবে দেখেছি। আইনমন্ত্রী থাকাকালে মতিন খসরুই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের লক্ষ্যে কুখ্যাত ইনডেমনিটি আইন বাতিলের বিল সংসদে তোলেন। সেদিন সংসদে দেওয়া তার বক্তব্য তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার যেন সঠিকভাবে হয় সেজন্য আইনমন্ত্রী থাকাকালে প্রতিদিন রাত ১১টার দিকে তিনি সরকারপক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে বসতেন। সে সময় তার মা ও স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন। তারপরেও তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। বর্তমান আইনমন্ত্রী বলেন, সর্বশেষ গত ৯ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনের শেষ মিটিংয়ে আমরা দুজন পাশাপাশি বসি। সেদিন মতিন খসরু তার বক্তব্যে আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘আমি এর আগে বারের সভাপতি পদে দুইবার ফেল করেছি, এবার আপনারা আমাকে হ্যাটট্রিক করাবেন না।’ প্রয়াত আসলামও একজন বড় মনের মানুষ ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, মানুষ জন্মালে মৃত্যুবরণ করতে হয়। কিন্তু কিছু মৃত্যু হূদয়ে দাগ ফেলে দেয়। মতিন খসরু শুধু একজন এমপি ছিলেন না, নিজ এলাকায় তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ’৯৬ সালের ১২ নভেম্বর ইনডেমনিটি আইন বাতিলের বিল উত্থাপনকালে তার সেই অসাধারণ বক্তব্য শুনেছি। এবার সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তার স্ত্রী আমাকে ফোন করে বলেছিলেন- প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তারা কৃতজ্ঞতা জানাতে চান। তবে তার সেই ইচ্ছা আর পূরণ হলো না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রয়াত আসলামুল হক এলাকায় গরিব মানুষ ও গরিব কর্মীদের কল্যাণে সবসময় কাজ করেছেন।
জাপা চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদের বলেন, ইতিহাসে মতিন খসরুর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, এই করোনা আমাদেরকে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সতর্ক করছে। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, সংবিধানের ওপর সামরিক সরকারের যে ছায়া তা ইনডেমনিটি আইন বাতিলের মাধ্যমে সরানোর কাজটি শুরু করেন মতিন খসরু। করোনা ও দুর্নীতির ভাইরাসে যখন আমরা ক্ষতবিক্ষত তখন তাদের মতো দুই জন সহকর্মীকে আমরা হারালাম। জাপার ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, মতিন খসরু অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ ছিলেন। আসলাম নিজের টাকায় এলাকায় অনেক রাস্তাঘাট করেছেন। অধ্যাপক আলী আশরাফ বলেন, করোনা পৃথিবীকে কঠিন সংকেত দিচ্ছে। জাপার কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, করোনা কত মানুষের জীবন নিয়ে যাচ্ছে। মতিন খসরু ও আসলাম দুজনই আমার ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাদের মৃত্যুর পর যখন নিজের মোবাইল থেকে তাদের নম্বরটি চিরদিনের জন্য মুছে দিই তখন খুব কষ্ট লাগে।
আলোচনা শেষে প্রয়াতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংসদে উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। এরপর মোনাজাত করা হয়। পরে সর্বসম্মতিক্রমে উত্থাপিত শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। চলমান সংসদের কোনো সদস্য মারা গেলে সংসদে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শেষে সংসদের বৈঠক মুলতবির রেওয়াজ রয়েছে। সেই অনুযায়ী শোক প্রস্তাব গ্রহণ শেষে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বৈঠক মুলতবি করেন।
